শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আছেন যারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আছেন যারা

বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বেছে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংস্থা জাতিসংঘ, যিনি ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরই মধ্যে পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

নজিরবিহীন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ এবং ভয়াবহ বাজেট সংকটে থাকা জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন পাঁচ নারী ও তিন পুরুষ।

প্রার্থীরা হলেন- বর্তমানে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসি, কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, চিলির মিশেল ব্যাচেলেট, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট, ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি, উগান্ডার ওলার ওতুন্নু এবং সেনেগালের ম্যাকি সাল।

বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো এ বিষয়ে বিভক্ত থাকায় কে এগিয়ে আছেন, তা বলা কঠিন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তবে প্রার্থীদের সমর্থন যাচাইয়ে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এগিয়ে ছিলেন।

প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়—

image
রাফায়েল গ্রোসি

রাফায়েল গ্রোসি

জাতিসংঘ পরিচালিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি আর্জেন্টিনার পেশাদার কূটনীতিক। ২০১৯ সাল থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান। এ দায়িত্ব তাকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

একই সঙ্গে ইউক্রেনের রুশ-অধিকৃত জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

মহাসচিব পদে প্রচারণা চালানোর জন্য তিনি বর্তমান দায়িত্ব ছাড়েননি। দীর্ঘদিন বৈশ্বিক সংস্থাটির মহাসচিব হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

৬৫ বছর বয়সী গ্রসির মতে, তা করা হবে ‘দায়িত্বে অবহেলা।’

কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, জাতিসংঘে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে গ্রসি আরও জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তারা মনে করেন, জাতিসংঘের মহাসচিবের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

image
রেবেকা গ্রিনস্প্যান

রেবেকা গ্রিনস্প্যান

কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রধান। তবে জাতিসংঘের শীর্ষ পদে প্রচারণা চালাতে তিনি দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছেন।

২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন দখলের পর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে শস্য রপ্তানি চালু রাখতে ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে তিনি কূটনৈতিক সাফল্য দেখান।

৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান নিজের পারিবারিক ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেন। তিনি ইহুদি বাবা-মায়ের সন্তান। তার ভাষায়, তারা হলোকাস্টে ‘কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন’ এবং পরে কোস্টারিকায় অভিবাসী হন।

image
মিশেল ব্যাচেলেট

মিশেল ব্যাচেলেট

গত ২৩ সেপ্টেম্বর চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেটকে মনোনয়ন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাচেলেট দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০১০-২০১৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নারী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এবং ২০১৮-২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

৭৪ বছর বয়সী বাচেলেত বলেছেন, বড় শক্তিগুলোর চাপের মধ্যেও জাতিসংঘের মহাসচিবের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ‘নৈতিক কণ্ঠস্বর’ থাকা উচিত।

মেক্সিকো ও ব্রাজিল তাকে সমর্থন করছে। তবে কট্টর-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত দায়িত্ব নেওয়ার পর চিলি তার সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। বিশেষ করে গর্ভপাতের অধিকারের প্রতি তার সমর্থনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রও বাচেলেতের সমালোচনা করেছে।

মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা

ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপিনোসা জাতিসংঘকে মানবজাতির অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি জাতিসংঘে আরও ব্যাপক সংস্কার চান।

৬১ বছর বয়সী এসপিনোসা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি। সম্ভাব্য সংঘাতের লক্ষণ শনাক্ত ও সতর্ক করতে তিনি একটি ‘আগাম সতর্কতা’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।

অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। তবে নিজ দেশ ইকুয়েডর তাকে সমর্থন করেনি।

ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট

৫২ বছর বয়সী রড্রিগেস-বির্কেট গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অঙ্গনে জাতিসংঘকে তার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ফিরিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, ‘শান্তি ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘকে বিচার করা হয়। কিন্তু জাতিসংঘ এর চেয়ে অনেক বড়। উন্নয়ন, মানবাধিকারসহ অনেক ক্ষেত্রে সংস্থাটি কাজ করছে।’

ইভোনে এ-বাকি

৭৫ বছর বয়সী ইভোনে এ-বাকি ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও রাজনীতিক। তিনি ওয়াশিংটনে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সেখানে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বলে মনে করা হয়।

টোঙ্গার মনোনীত প্রার্থী এ-বাকির উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি কাতারে ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

লেবানিজ বাবা-মায়ের সন্তান এ-বাকি ১৯৯৫ সালের সংক্ষিপ্ত সীমান্তযুদ্ধের পর ইকুয়েডর ও পেরুর মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বেঁচে এসেছি। জাতিসংঘ সনদের মৌলিক অঙ্গীকার পরবর্তী প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা নতুন করে বাস্তবায়নে সহায়তা করতে আমি প্রস্তুত।’

ম্যাকি সাল

৬৪ বছর বয়সী ম্যাকি সাল একমাত্র প্রার্থী, যিনি ল্যাটিন আমেরিকার নন। রীতি অনুযায়ী পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিব ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আসার কথা।

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাল শান্তি ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

আফ্রিকান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান বুরুন্ডির প্রস্তাবিত প্রার্থী সাল এ সপ্তাহে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের সমর্থনও পেয়েছেন।

সেনেগালের কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সহিংস রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এসব বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন।

ওলার ওতুন্নু

৭৫ বছর বয়সী ওতুন্নু ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের অধীনে শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি জাতিসংঘে উগান্ডার দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অল্প সময়ের জন্য দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

২০১১ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল উগান্ডা পিপলস কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন ওতুন্নু। তবে ১৯৮৬ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা দীর্ঘদিনের নেতা ইয়োওয়েরি মুসেভেনির কাছে তিনি পরাজিত হন।

কীভাবে নির্বাচন হবে?

১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ গোপন ব্যালটে ভোট দেবে, যাকে স্ট্র পোল বলা হয়- যতক্ষণ না তারা একজন প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। প্রতিটি সদস্য প্রার্থীর পক্ষে ‘সমর্থন’, ‘অসম্মতি’ বা ‘মত নেই’ ভোট দিতে পারে। পরে সেই প্রার্থীর নাম সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করবে নিরাপত্তা পরিষদ। ২০১৬ সালে যখন গুতেরেসকে সাধারণ পরিষদে সুপারিশের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল, তখন নিরাপত্তা পরিষদের একমত হতে ছয়টি স্ট্র পোল লেগেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স — এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন) ঐকমত্যই এখানে মুখ্য।

নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ পাওয়ার পর সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নিয়োগ অনুমোদন করবে, যা ঐতিহ্যগতভাবে আনুষ্ঠানিকতাই মাত্র। কারণ সাধারণ পরিষদ কখনও নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীকে নিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায়নি, তাই বলা যেতে পারে যে নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্ধারণ করে।

মহাসচিবের দায়িত্ব কী?

জাতিসংঘের সনদে মহাসচিবকে বিশ্ব সংস্থাটির ‘প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ বলা হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে এই ভূমিকাকে ‘সমান ভূমিকার কূটনীতিক এবং আইনজীবী, বেসামরিক কর্মচারী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

গুতেরেস বর্তমানে ৩০ হাজারেরও বেসামরিক কর্মী এবং ১১টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন, যেখানে প্রায় ৬০ হাজার সেনা ও পুলিশ সদস্য রয়েছেন। জাতিসংঘের মূল বার্ষিক বাজেট ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে শান্তিরক্ষা বাজেট ৫.৬ বিলিয়ন ডলার।

যেহেতু সামরিক ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞার অনুমোদন নিরাপত্তা পরিষদের হাতে, তাই মহাসচিবের ক্ষমতা সীমিত। অনেকে কূটনীতিক বলেন, নিরাপত্তা ভেটো ক্ষমতাধারী পাঁচ স্থায়ী সদস্য এমন কাউকেই পছন্দ করেন, যিনি ‘জেনারেল’- এর চেয়ে ‘সচিব’ ভূমিকা বেশি পালন করবেন। 

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর