বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়াকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে প্রতিবেশী ভারতের নীতি নির্ধারণী মহল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতন এবং রাষ্ট্রপতির পদে এই বড় পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। দিল্লির জন্য এটি ভালো নাকি খারাপ খবর—তা নিয়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, মির্জা ফখরুল অতীতে ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা এবং শেখ হাসিনাকে ভারতের একতরফা সমর্থনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন মির্জা ফখরুল।

পত্রিকাটি আরও মনে করিয়ে দেয় যে, ২০২৬ সালেই দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মির্জা ফখরুল ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করেছেন যে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এই চুক্তির ওপর নির্ভর করবে এবং ভারত যেন বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী এটি কার্যকর করে। এটি দিল্লির ওপর একটি বড় কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়াকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, গঙ্গা পানি চুক্তি এবং ফখরুলের অতীতের কড়া সমালোচনামূলক অবস্থানের আলোকে বিশ্লেষণ করেছে।

তবে সংবাদমাধ্যমটি আরও উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও আলংকারিক। মূল নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডা সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় কোনো বিপর্যয় আনবে।
বিপরীতে দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক সততা, শান্ত ব্যক্তিত্ব এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দিয়ে, এই পরিবর্তনকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে।
‘দ্য কোয়াইট ম্যান ইন বঙ্গভবন’— শিরোনামে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, উগ্র বা আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে সবসময়ই পরিমিত ও মার্জিত ভাষা ব্যবহারের জন্য পরিচিত মির্জা ফখরুল। নিজেকে একজন লিবারেল ডেমোক্র্যাট বা উদারপন্থী গণতন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ফখরুল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার বিরোধী এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও, নির্বাহী বিভাগের আধিপত্যের মুখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং একটি শক্তিশালী একক দলের শাসনে সাংবিধানিক ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখাই এখন তার প্রধান পরীক্ষা।
এছাড়াও তুলনামূলক ইতিবাচক দিক তুলে ধরে জি নিউজ লিখেছে, মির্জা ফখরুল ইতোপূর্বে বিএনপির ‘ভারত-বিরোধী’ তকমা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি নয়াদিল্লির সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, যা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারে।
ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া দিল্লির জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষা। হাসিনা সরকারের মতো অন্ধ-সমর্থন না পেলেও, বিএনপির এই প্রবীণ নেতার পরিপক্ব কূটনীতির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক একটি বাস্তবসম্মত ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের দিকে মোড় নিতে পান বলে প্রত্যাশা তাদের।
এমএইচআর




