দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হচ্ছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) আকস্মিকভাবে মহড়াটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশের পর। কয়েক দিন আগে পেন্টাগনকে মহড়ার পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও আরও ১১টি মিত্র দেশের সেনারা এবারের মহড়ায় অংশ নিচ্ছিলেন। চলমান মহড়া মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘অনুপযুক্ত ও শত্রুতামূলক’। একই সঙ্গে এসব মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল বলেও মনে করেন তিনি।
তবে মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জন্যও আকস্মিক ছিল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সিদ্ধান্তটিকে দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ফল হিসেবে তুলে ধরলেও স্বীকার করেছেন, মহড়া কমানোর বিষয়ে মার্কিন সিদ্ধান্তের কথা দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা আগে থেকে জানতেন না।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প যদি সামরিক মহড়া কমানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনার সংখ্যাও কমিয়ে দেন, তাহলে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে আগ্রহী ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে।
এর আগে ২০১৮ সালে ট্রাম্প ও কিম প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। পরে পানমুনজমে দুই নেতার একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক হলেও অর্থবহ আলোচনা আর এগোয়নি।
এবারও ট্রাম্প সামরিক মহড়া কমিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ তৈরি করতে চাইছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থান আগের চেয়ে কঠোর। কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া কখনোই তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবে না। এসব অস্ত্র আঞ্চলিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প-কিম বৈঠক হলেও তা থেকে বড় কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখে আসছে। দেশটিতে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তাই যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি মহড়া বন্ধের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উপস্থিতি কমানোর দিকে এগোতে পারে।
আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা নয়: ট্রাম্প
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জো বি-ইউনের মতে, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিকল্প খুব বেশি নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট দেশটির জন্য ‘জীবন-মরণের বিষয়’ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে জাপান ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। কারণ আঞ্চলিক নিরাপত্তায় তারাও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে আসছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বেগ আরও বেড়েছে কারণ ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তা ও বাণিজ্যকে আলাদা করে দেখছে না।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প আগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও তার ক্ষোভ রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখতে দেশটির দেওয়া অর্থ যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও ধীরগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো প্রয়োজন কি না।
দেশটির সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেয়ং সিয়ং-চ্যাং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বজায় রাখার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সামরিক মহড়া কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে উত্তর কোরিয়া অবশ্য বড় কোনো ছাড় হিসেবে দেখছে না। কিম ইয়ো জং বলেছেন, মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তে তাদের আগ্রহ বা মন্তব্য করার মতো কিছু নেই। মহড়ার ‘শত্রুতামূলক ও আক্রমণাত্মক চরিত্র’ এতে বদলাবে না।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। দেশটি ছয়বার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে পিয়ংইয়ং। হাজার হাজার উত্তর কোরীয় সেনা সেখানে হতাহত হলেও যুদ্ধের মাধ্যমে তারা ড্রোন পরিচালনা ও আধুনিক যুদ্ধকৌশলের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া কমে গেলে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সুবিধা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে দেখেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি তাঁর ‘গভীর বিবেচনার’ ফল এবং একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।
লি একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের আরও বেশি নেওয়া উচিত-ট্রাম্পের এই মতের সঙ্গেও তিনি একমত হয়েছেন।
অর্থাৎ, দক্ষিণ কোরিয়া একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়ে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক প্রত্যাহারের ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া মাঝপথে বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয় কমানোর নীতি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধ এবং কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় হিসাব কাজ করছে।
তবে উত্তর কোরিয়া যদি পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগে রাজি না হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি কমাতে থাকে, তাহলে কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এমআই




