পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝখান থেকে অল্পের জন্য রক্ষা ও সুস্থ শরীরে ফিরে আসা অনিক কুন্ডু নামে এক বাংলাদেশির বয়ানে উঠে এসেছে এ ঘটনার চরম আতঙ্কের মুহূর্ত। তার মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি সরাসরি মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখেছিলেন।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে পুরো ঘটনা ও বেঁচে ফেরার বর্ণনা দিয়েছেন অনিক।
পোস্টে তিনি জানান, আগুন লাগার সময় তিনি তার বাবা, মা এবং পাশের রুমের একটি বাংলাদেশি দম্পতি ও শিশুসহ আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির সাথে ভবনের তিন তলায় আটকে পড়েছিলেন। সিঁড়ি এবং লিফটের দিকে প্রচণ্ড আগুন আর কালচে ধোঁয়া থাকায় নিচে নামা বা ছাদে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না। বাধ্য হয়ে তারা বাথরুমের জানালা ও ভেন্টিলেটর খুলে কোনো রকমে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং মোবাইল ফোনে ফায়ার সার্ভিসকে তাদের আটকে থাকার কথা জানান। পরবর্তীতে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনেন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
তিনি আরও জানান, উদ্ধার পাওয়ার পর তিনি তার চোখের সামনে অন্তত ৩টি অ্যাম্বুলেন্সে করে মৃতদেহ ও আহতদের নিয়ে যেতে দেখেছেন।

অনিক অভিযোগে করেন, অগ্নিকাণ্ডের পর ওই এলাকার কোনো হোটেল নতুন করে কাউকে জায়গা দিতে রাজি না হওয়ায়, আতঙ্কগ্রস্ত এই পরিবারটিকে সারারাত খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ভবন থেকে নিজেদের জিনিসপত্র উদ্ধার করে তারা অন্য একটি হোটেলে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তারা শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন।
তিনি আরও বলেন,
দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফিরে এই বাংলাদেশি ক্ষোভ প্রকাশ করে কলকাতার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থার দিকেও আঙুল তুলেছেন। তার মতে, ব্যবসায়ীরা শুধু মুনাফাই করে যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বা অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থার কোনো বালাই নেই।

আক্ষেপের সুরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রতিটা শহর ঢাকা, কলকাতা যেন একটা মরন বোমা। কোথাও যেন অগ্নিনির্বাপক কোন ব্যবস্থা নাই। ব্যবসায়ীরা শুধু টাকা কামায়েই যাবে? মানুষের জীবনের মূল্য ঠিক কোথায়?
পোস্টে আবেগতাড়িত হয়ে কলকাতায় আসা অন্যান্য বাংলাদেশি নাগরিক এবং রোগীদের খোঁজ নেওয়ার জন্য স্বজনদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন অনিক। একই সাথে জীবনের চরম অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সবাইকে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেরই অনেকের সাথে শেষ দেখা হয়ে গেছে। যে যার সাথে পারেন ভাল ব্যবহার করুন।’
এরআগে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিবাগত রাত ২টার দিকে শহরের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামে একটি আবাসিক হোটেলে আগুন লাগে। এতে বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন, তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শনাক্ত হওয়া মৃত ব্যক্তিরা হলেন— কুষ্টিয়া সদর উপজেরার আরুয়াপাড়ার বাসিন্দা ও আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি দেবাশিস দত্ত (৩৭), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তাদের তার শিশুসন্তান শর্ণশিষ দত্ত (২) এবং দেবাশিসের শশুর মো. আকরাম আলী (৬৪)। এছাড়া ঢাকার সাভারের বেগুনবাড়ি এলাকার শিশু আহমেদ বাবু (২) এবং ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার ১৯ বছর বয়সী তরুণ সন্দীপ পাসওয়ান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া বাকি তিনজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। তাদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে নিহত ৯ জনের শরীরে বড় ধরনের পোড়া দাগ পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান, হোটেলের স্যুইচ বোর্ড অথবা এসি থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আগুন লাগা এই হোটেল ভবনসহ আশেপাশের এলাকাটি কলকাতায় আসা বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসা প্রত্যাশীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
(ঘটনার বর্ণনা অনিক কুণ্ডর ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া)
এমএইচআর




