বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অরুণাচল সীমান্তে চীনের ভয়ে টহল দিতে পারছে না ভারতীয় সেনারা 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

অরুনাচল সীমান্তে ভয়ে টহল দিতে পারছে না ভারতীয় সেনারা 

ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় চীনের বাহিনীর ঢুকে পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশের সুযোগ হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে দুদেশের মধ্যে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আঞ্চলিক রাজনৈতিক মিত্র দলের একটি অনুসন্ধানী দল এসব অভিযোগ তুলেছে। খবর আল জাজিরার। 

সোমবার (১৭ আগস্ট) আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পার্বত্য জেলা আপার সুবানসিরিকে ঘিরে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি, সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় চীনা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টে প্রবেশ করতে দেয়নি তারা।

এই অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এল, যখন সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমান্ত উত্তেজনার পর ভারত ও চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। 

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের সঙ্গে চীনের ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সীমান্ত রয়েছে, যা নয়াদিল্লির উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত বরাবর জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশের মতো অঞ্চলে বিস্তৃত। 

এই সীমান্তের বড় অংশই বিতর্কিত। এমনকি সীমানা নির্ধারণী রেখা বা তথাকথিত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা নিয়েও একমত নয় ভারত ও চীন।

অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল বা পিপিএ’র একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি আপার সুবানসিরি পরিদর্শন করে। দলটি বিজেপি নেতৃত্বাধীন নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তকসিং এলাকায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রচণ্ড বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে ভারতীয় সেনারা নিয়মিত টহল দিতে পারেন না। 

বিপরীতে, চীনা বাহিনী এ সময়ও সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় থাকে। এতে সীমান্তে ভারতের অবকাঠামো ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানী দলের সদস্য জেরাং দাবি করেছেন, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট থেকে সরে যায়। পৈতৃক জায়গা হারানোর কারণে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ বলে আল জাজিরাকে জানান জেরাং।

তিনি আরও বলেন, এই অনধিকার প্রবেশ নতুন বা আকস্মিক নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বেড়েছে। অথচ নয়াদিল্লি এবং রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলো সীমান্তের মানুষের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও গত মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করে, চীনা অনুপ্রবেশ ‘বহুগুণ বেড়েছে’ এবং চীন যতটা সম্ভব ভূমি দখলের চেষ্টা করছে।

skn_st

অবশ্য ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনা অনুপ্রবেশের প্রতিবেদনকে সরাসরি ‘ভুল এবং ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারত বরাবরই চীনকে জানিয়েছে যে সীমান্তের পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। 

তিনি বলেন, ‘আমরা বেইজিংকে এও বলেছি যে সীমান্ত পরিস্থিতির অবস্থা আমাদের বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।’

নয়াদিল্লির মতোই বেইজিংও সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে সীমান্ত উত্তেজনার বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটাই করেনি দেশটি। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও ​​জিয়াকুন জানান, ত সপ্তাহে উভয় দেশ চীন-ভারত সীমান্ত বিষয়ক তাদের ৩৬তম বৈঠক করেছে। এবং কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রেখে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় একমত হয়েছে।

প্রায় সাড়ে ৩ হাজার দৈর্ঘ্যের ভারত-চীন সীমান্তের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলএসি নিয়েও একমত নয় দুদেশ। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তৎকালীন তিব্বত সিমলা কনভেনশনের মাধ্যমে ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করেছিল। 

ভারত স্বাধীনতার পর এটিকে চীনের সঙ্গে পূর্ব সীমান্ত হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে।

বেইজিং অরুণাচল প্রদেশের পুরো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা জাংনান নামে অভিহিত করে। অন্যদিকে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চীনের ওপর ভারত ও পাকিস্তান সম্পূর্ণ মালিকানা দাবি করে।

১৯৬২ সালে, ভারত ও চীন তাদের বৃহত্তর সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনার সময়, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখাকে (এলএসি) তাদের কার্যত সীমান্ত হিসেবে গণ্য করতে সম্মত হয়েছিল। এই রেখাটি ছিল তাদের প্রত্যেকের নিয়ন্ত্রিত প্রকৃত এলাকাকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে একাধিকবার দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনা সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হন। 

সিকিমের নাকু লা এলাকাতেও ২০২০ ও ২০২১ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ২০১৭ সালে ভুটান, ভারত ও চীনের ত্রিসীমান্তবর্তী ডোকলাম মালভূমিতে চীনের সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে ৭৩ দিনের উত্তেজনাপূর্ণ সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। 

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা বিষয়ক অধ্যাপক বি আর দীপকের মতে, সীমান্তে ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও ভারত ও চীনের বাণিজ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারতের বেইজিং দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্য ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

তবে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট। ওই সময়ে চীন থেকে ভারতের আমদানি ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন থেকে মাত্র ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হলেও সীমান্ত বিরোধের মূল কারণগুলো এখনো সমাধান হয়নি। 

ফলে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রকৃত স্বাভাবিক সম্পর্কের বদলে ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর