বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে ইসরায়েল!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে ইসরায়েল!

পাকিস্তানের অশান্তি সৃষ্টির পেছনে কাজ করছে দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল। আর তকে এ কাজে ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত! 

পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করতে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে কাজ করছে ইহুদি রাষ্ট্রটি। 

পাকিস্তানের ওই সর্ববৃহৎ প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াইকে ঘুরপথে সমর্থন জানানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।

দক্ষিণ পশ্চিম প্রদেশটি পাকিস্তানের থেকে পৃথক হলে কী কী সুবিধা হবে ইহুদিদের? লাভের গুড়ে কতটা ভাগ পাবে ভারত?

পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী। ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ফুসিয়ে তুলে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে সেখানকার গণবিক্ষোভ। 

pakis

শুধু তা-ই নয়, রাওয়ালপিন্ডির সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ‘যুদ্ধ’ চলছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। এহেন পরিস্থিতিতে পর্দার আড়াল থেকে বিদ্রোহীদের মদদ দিচ্ছে ইসরায়েল।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযানে নামলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। 

তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, লড়াই শুরুর ঠিক এক দিন আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক অন্যতম থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা মেমরি। এর পোশাকি নাম ‘বেলুচিস্তান স্টাডিজ প্রজেক্ট’।

গত ১২ জুন থেকে এ প্রদেশটিকে নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রবন্ধ, ছবি, গবেষণা এবং সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করছে মেমরি। সেগুলির অধিকাংশতেই পশ্চিমি দুনিয়ার ‘স্বাভাবিক বন্ধু’ হিসাবে বেলোচিস্তানকে তুলে ধরা হচ্ছে। 

সন্দেহের এখানেই শেষ নয়। মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন কর্নেল ইগাল কারমন, কর্মজীবনের প্রথম ২০ বছর যিনি কাটিয়েছেন ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদে।

মেমরির বিরুদ্ধে ২০১২ সাল থেকে ইহুদি রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্য পাচারের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সেই লক্ষ্যেই ১৯৯৮ সালে ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দফতর খোলেন সুচতুর ইসরায়েলি কর্নেল। 

বর্তমানে তার ওয়েবসাইটের বেলোচিস্তান সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি অনুবাদ ও প্রকাশ করছে আরবি, ফারসি ও তুর্কিভাষী একাধিক গণমাধ্যম। পাশাপাশি, ভাইরাল হচ্ছে স্ক্রিনশটও।

দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম বড় মুখ হলেন মির ইয়ার বালোচ। এ বছরের মে মাসে এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তিনি। 

২০২৫ সালে জঙ্গি দমনের নামে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে ভারত। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’। একে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশীর সংঘাত চলাকালীন খোলাখুলি ভাবে দিল্লিকে সমর্থন জানান মির ইয়ার বালোচ।

মেমরি আবার এই বেলোচ জাতীয়তাবাদী ও মানবাধিকার কর্মীকে ‘বিশেষ উপদেষ্টা’ হিসাবে নিয়োগ করেছে। মির ইয়ারকে কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘অন্ধ ভক্ত’ বলে মনে করে থাকেন। 

পাক সেনাবাহিসীর যাবতীয় গোপন তথ্য ফাঁসে সমাজমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে দেখা যায় তাকে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের কাছে বেলুচিস্তানে শান্তি বাহিনী পাঠানোর আর্জি জানিয়ে ইসলামাবাদের চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি।

এসব কিছুই করছেন তিনি ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতায়। এ বছরের জানুয়ারিতে ‘বেলুচিস্তান: কৌশলগত অন্ধবিন্দু’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েলে’ প্রকাশিত হতেই আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয় হইচই। 

সেখানে পাকিস্তানের ওই প্রদেশটি নিয়ে তেলআবিবের মাথাব্যথার একাধিক কারণ তুলে ধরেন ইহুদি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার হোসে লেভ আলভারেজ গোমেজ। পাশাপাশি, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার যুদ্ধকে সমর্থনের কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাকে।

ইসরায়েলের নিরিখে তিনটি কারণে বেলুচিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশটির কৌশলগত অবস্থান। এর সঙ্গে ইহুদিদের শত্রুরাষ্ট্র ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার লম্বা সীমান্ত রয়েছে। তা ছাড়া এলাকাটিকে আরব সাগরের ‘প্রবেশদ্বার’ বলা যেতে পারে। 

গোমেজ তার প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বেলুচেরা স্বাধীনতা পেলে কোয়েটায় দূতাবাস খোলার সুযোগ পাব আমরা। তখন তেহরান ও ইসলামাবাদ, দু’জায়গাদের নজরদারি অনেক সহজ হবে।’

ইরানের মতো ধর্মীয় কারণে ইসরায়েলকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি পাকিস্তান। উল্টো বহুবার প্রকাশ্যে ইহুদিদের উপর পরমাণু হামলার কথা বলতে শোনা গিয়েছে সেখানকার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা-নেত্রীদের। 

তাই গোড়া থেকেই ইসলামাবাদকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে তেলআবিব। রাওয়ালপিন্ডির আণবিক অস্ত্র যে কোনও মুহূর্তে ইহুদি রাষ্ট্রটিকে টার্গেটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়নি মোসাদ।

তেহরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বহু কমান্ডারের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক রয়েছে একাধিক পাক সেনাবাহিনীর জেনারেলের। ফলে প্রয়োজন হলেই গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে থাকেন তারা। 

ইহুদিদের নানা অপকর্মের তথ্য আদান-প্রদান চলে তাদের মধ্যে। বেলুচিস্তানের মাটি ব্যবহার করে এই আঁতাঁত ভাঙতে চায় ইসরায়েলি কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশটি খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ। সেখানকার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম, তামা, কয়লা এবং বিরল ধাতুর (রেয়ার আর্থ মিনারেলস) বিপুল ভান্ডার। 

বেলুচিস্তান স্বাধীনতা পেলে এগুলিতে লগ্নির রাস্তা খুলবে ইসরায়েলের। এর উপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে পারে তেলআবিবের। তা ছাড়া এতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ পাবে ইহুদিরা।

বেলুচিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর হল গদর। এর পরিকাঠামোগত নির্মাণকাজ চালাচ্ছে চীন। এলাকাটি থেকে ইরানের চাবাহার বন্দরের দূরত্ব মেরেকেটে ১৭০ কিলোমিটার। 

স্বাধীনতা পেতে গদর থেকে বেইজিংকে তাড়াতে বর্তমানে উঠেপড়ে লেগেছে দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের প্রায় সব বিদ্রোহী গোষ্ঠী। লাগাতার চীনা শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর হামলা চালাচ্ছে তারা। এতে উদ্বিগ্ন ইসলামাবাদ।

গোমেজ মনে করেন, গদর থেকে চীন সরে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করতে পারে ইসরায়েল। এতে ভারত-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা অনেক বেশি সহজ হবে। 

অন্য দিকে, ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বেলুচিস্তানেরও একাধিক স্বার্থ রয়েছে। পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ প্রদেশ ছিনিয়ে নিতে চাই অত্যাধুনিক হাতিয়ার। তাদের সেই চাহিদা পূরণ করতে পারে ইসরায়েল।

তা ছাড়া গত কয়েক বছর ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে বেলুচিস্তান। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা মির ইয়ার বালোচের পোস্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের একাধিক এলাকায় নিজস্ব মুদ্রা চালু করার চেষ্টা করছে বিছ্ছিন্নতাবাদীরা। কিন্তু, জাতিসংঘের বিভিন্ন আইনের কারণে সরাসরি কোনও রাষ্ট্র সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামনে রেখে সেটা আদায়ের ছক কষছেন তারা।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধে নেমে খুব দ্রুত ইরানকে হারানো যাবে বলে একরকম নিশ্চিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও বাস্তবে সেটা হয়নি। 

ফলে বেলুচিস্তান নিয়ে ইসরায়েলি চাপ বাড়লে একে পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট প্রদেশটি পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশের বেশি জমি নিয়ে গঠিত। অথচ সেখানকার জনসংখ্যা বেশ কম। ফলে সহজে মুঠো আলগা করবে না ইসলামাবাদ। 

উলেআ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলিকে নিশ্চিহ্ন করতে সামরিক অভিযানের তীব্রতা বাড়াচ্ছে পাকিস্তান।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর