বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। মহাজাগতিক এই বিরল দৃশ্য দেখতে স্পেনে জড়ো হতে পারেন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। তবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের এই আয়োজনের মধ্যেই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে দাবানলের শঙ্কা। তীব্র গরমে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাসের পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জারি করা হয়েছে উচ্চ ও অতি উচ্চ দাবানলঝুঁকির সতর্কতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৩৫ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করছে দেশটির সরকার।
স্পেনের যেসব এলাকায় সবচেয়ে ভালোভাবে পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে, সেসব অঞ্চলে বিপুল দর্শনার্থীর আগমন সামাল দিতে ৬৬০টি নির্ধারিত পর্যবেক্ষণস্থল, পার্কিং ও ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ সূর্যগ্রহণ দেখতে এসব এলাকায় জড়ো হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: এই আগস্টেই অন্ধকারে ডুববে পৃথিবী!
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক সুরক্ষা ও জরুরি বিভাগের মহাসচিব ভিরহিনিয়া বারকোনেস বলেন, বড় জনসমাগম থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন ঝুঁকি, বিশেষ করে ফেলে দেওয়া সিগারেট থেকে আগুন লাগার আশঙ্কা কমাতে ৩৫ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে।
তিনি বলেন, স্পেনে অত্যন্ত কঠিন একটি গ্রীষ্ম যাচ্ছে। আবারও বড় ধরনের কয়েকটি দাবানল মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই যেকোনো ধরনের এমন কর্মকাণ্ড সীমিত করতে হবে, যা আগুনের স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে।
তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে
মাদ্রিদে স্থাপিত একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে আঞ্চলিক সরকারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করবে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বুধবার সন্ধ্যায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণটি স্পেন ও আইসল্যান্ডের নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে দেখা যাবে। মহাজাগতিক এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে।
স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইমেট সূর্যগ্রহণের দিন দেশটির বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সতর্কতা জারি করেছে। এসব এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও দাবানলের ‘উচ্চ ঝুঁকি’, আবার কোথাও ‘অতি উচ্চ’ বলে সতর্ক করা হয়েছে।
স্পেনের পাশাপাশি ফ্রান্স ও গ্রিসও চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। ক্রমেই শুষ্ক হয়ে ওঠা ইউরোপে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পেনের হুয়েলভা, সেগোভিয়া ও হুয়েস্কা প্রদেশে তিনটি বড় দাবানল সক্রিয় ছিল। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ২ লাখ হেক্টর এলাকা দাবানলে পুড়ে গেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।
স্পেনের ফরেস্ট টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠনের মহাসচিব রাউল দে লা কায়ে বলেন, ‘এটি বছরের অত্যন্ত খারাপ একটি সময়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্পেনে সবচেয়ে বেশি দাবানল হওয়ার সপ্তাহগুলোর একটি এটি।’
গ্রামাঞ্চলে জনসমাগম নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ছোট ছোট শহরের কিছু বাসিন্দাও নিজেদের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছেন। তারা দর্শনার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন।
মাদ্রিদের উত্তরে প্রায় ২ হাজার মানুষের শহর বুইত্রাগো দে লোসোয়া-তে স্থানীয় সংগঠন ‘মন্তে এন পিয়ে’ (বন রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ) বনাঞ্চলের কাছে পরিকল্পিত বিভিন্ন আয়োজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে।
কাছের শহর ত্রেস কান্তোস দাবানলের ঝুঁকির কারণে সূর্যগ্রহণের দিন সব ধরনের অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। তবে বুইত্রাগোর কাছে একটি পর্যবেক্ষণস্থলে প্রায় ৩ হাজার মানুষ, যার মধ্যে মাদ্রিদ অঞ্চলের নেতারাও রয়েছেন, জড়ো হওয়ার কথা রয়েছে।
‘মন্তে এন পিয়ে’-এর বক্তব্য, সূর্যগ্রহণ মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হলেও বড় ধরনের দাবানলে যে ক্ষতি হতে পারে, তা কয়েক দশক ধরে থেকে যেতে পারে।
সংগঠনটির প্রধান আনা হার্নান্দেজ বলেন, ‘আমরা এমন একটি এলাকায় আছি যেখানে দাবানলের ঝুঁকি অনেক বেশি। গ্রামাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হওয়ায় বারবিকিউ করা ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিষিদ্ধ। যত বেশি মানুষ আসবে, বিপদও তত বাড়বে।’
কর্তৃপক্ষের ধারণা, সূর্যগ্রহণের দিন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ গাড়িতে করে স্পেনের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে যাবেন। এসব এলাকাই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথের মধ্যে পড়েছে।
দাবানল প্রতিরোধে জাতীয় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন পর্যটন ফোরামে দর্শনার্থীদের অননুমোদিত স্থানে গাড়ি না রাখা, ময়লা না ফেলা, বারবিকিউ না করা এবং দাবানলপ্রবণ গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ না করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স।
এমআর




