কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইউক্রেনের ৩টি স্থানে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল ইরান। তবে ইউক্রেন সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার পর তেহরান তাদের সামরিক অভিযান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি এই পরিকল্পনার তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, জাহাজে হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইউক্রেনের ৩টি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে (যার মধ্যে সমুদ্রবন্দর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়) পাল্টা হামলার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
এরআগে গত শনিবার (২৫ জুলাই) কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। এতে একজন ইরানি নাবিক নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীরি পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাহাজটি রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন তৈরির কাঁচামাল বহনের কাজে নিয়োজিত ছিল, যা তাদের জন্য একটি বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু।
অন্যদিকে হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কিয়েভকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘনের দায়ে ইউক্রেনকে এর কঠিন জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেন। এমনকি ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরে ছোট বিস্ফোরকবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল তেহরান।
এর পরপরই তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করে কিয়েভ। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে সরাসরি কথা বলেন।
তিনি আশ্বস্ত করেন, কোনো বেসামরিক সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়নি এবং এটি ছিল একটি ‘অনিচ্ছাকৃত’ ঘটনা।
পরে আরাঘচি এক্সে এক পোস্টে জানান, ইরান এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আর জটিল করতে চায় না। তবে ইরানি নাগরিকদের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইউক্রেনকে আনুষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ইউক্রেনের ‘সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিসইনফরমেশন’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে বড় ধরনের মিসাইল হামলার যে আশঙ্কা ছড়িয়েছিল, তা আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাত, তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এক বিন্দুতে মিলে এক ভয়াবহ বৈশ্বিক রূপ নিত। তবে দ্রুত কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে বা তাদের সাপ্লাই লাইনে হামলা সচল রাখতে চায়, কিন্তু ইরানের মতো কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে জড়াতে চায় না। এই কারণেই ড্রোন হামলার পর ইউক্রেন দ্রুত ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে একে "অনিচ্ছাকৃত" বলে উল্লেখ করেছে, যাতে ইরান রাশিয়ার পক্ষে সরাসরি ইউক্রেনের মাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা না চালায়।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তীব্র উত্তেজনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আরেকটি নতুন ফ্রন্টে সংঘাতে জড়াতে চাচ্ছে না তেহরান।
সূত্র: আনাদোলু
এমএইচআর




