ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের জেরে উত্তেজনার মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের পর সম্প্রতি কুয়েতের সঙ্গে ইসলামাবাদের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারে আগ্রহী হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়ছে।
২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-কুয়েত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটি চলতি মাসে কুয়েতের অনুমোদন পেয়েছে। এতে সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক বিনিময়ের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি যৌথ সামরিক কমিটিও গঠন করা হবে।

তবে চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন কিংবা এক দেশের পক্ষে অন্য দেশে সেনা মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
চুক্তি অনুমোদনের পরপরই কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল আহমাদ আল সাবাহ দুই দিনের সফরে পাকিস্তান যান। সফরে দুই দেশ প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সৌদি আরবের পর কুয়েত
কুয়েতের সঙ্গে এই চুক্তি এমন সময় কার্যকর হলো, যখন দুই বছরেরও কম সময় আগে পাকিস্তান ও সৌদি আরবও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করে।
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও উপদেষ্টা সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটের বিভিন্ন সময় ইসলামাবাদকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে রিয়াদ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়, এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

কেন এখন কার্যকর হলো এই চুক্তি?
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নুরাহ আল-শুয়াইবির ভাষ্য, আইনি কাঠামোর দিক থেকে এটি একটি প্রচলিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি হলেও এর কার্যকর হওয়ার সময়টি কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তার মতে, চুক্তিতে সামরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, লজিস্টিক সহায়তা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্বের মতো বিষয় রয়েছে। তবে এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
নুরাহ আল-শুয়াইবির মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় কুয়েত নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের পরিধি বাড়াতে আগ্রহী হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাচ্ছে। বরং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক নির্ভরযোগ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাইছে।
কেন পাকিস্তান?
উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং যৌথ সামরিক মহড়াতেও দেশটির সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শক্তিশালী সেনাবাহিনী, নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অভিজ্ঞতা এবং ক্রমবর্ধমান নৌ সক্ষমতার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চলতি বছর পাকিস্তানের নৌবাহিনী বহুজাতিক কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স-১৫০-এর নেতৃত্বও গ্রহণ করেছে। আরব সাগর ও আশপাশের জলসীমায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ?
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পৃথক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া নিয়েও কাজ করছে। একই ধরনের চুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বাহরাইন। এ ছাড়া জর্ডানও পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান কুয়েতের প্রধান নিরাপত্তা গ্যারান্টর হয়ে উঠবে না। দেশটি সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে বিদ্যমান অংশীদারত্ব আরও জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন মত
ইসলামাবাদের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (সিআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক ইয়াসির হুসেইনের মতে, কুয়েতের এই সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রতি আস্থার প্রতিফলন।
তার দাবি, বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় পাকিস্তান শুধু সৌদি আরব বা কুয়েতের নিরাপত্তা সহযোগী নয়, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক আসিফ দুররানির মতে, কুয়েতের সঙ্গে এই চুক্তিকে অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বহু বছরের পুরোনো। কুয়েতের অনুমোদন স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও বর্তমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতে গতি এনে থাকতে পারে।
দুররানির ভাষ্য, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের অর্থ পাকিস্তানের ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নয়। বিভিন্ন পক্ষের আস্থা ধরে রাখার সক্ষমতাই ইসলামাবাদের অন্যতম কূটনৈতিক শক্তি।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
এমএইচআর




