ভারতে শিক্ষার্থীদের গণগ্রেপ্তার, হয়রানি এবং সুপ্রিম কোর্টের নতুন নির্দেশনার প্রেক্ষিতে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ এনে পুনরায় দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। একই সঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে সংগঠনটি।
গতকাল মঙ্গলবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, দিল্লির যন্তর মন্তর এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে হওয়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যাদের আগে অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, তাদের এই ছাড় দেওয়া হবে না।
এই প্রসঙ্গে সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘সরকারের স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার যায় না। গোটা দেশের সামনে (সরকারের পক্ষ থেকে) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেটিকে সম্মান করা উচিত। সব এফআইআর প্রত্যাহার করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি অপরাধীরা অবাধে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে পুলিশের উচিত পূর্ববর্তী মামলাগুলোতে তাদের জামিন বাতিলের জন্য আদালতে আবেদন করা। তাদের এটাও ব্যাখ্যা করা উচিত যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তারা কীভাবে সমাজে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু সরকার এটাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক এফআইআর দায়ের করতে পারে না, কারণ এর ফলে পরবর্তীতে প্রকৃত প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।’
মোদি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে সৌরভ দাস বলেন, ‘সরকারকে যদি এই স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তবে তারা অবশ্যই এর অপব্যবহার করবে। যুবসমাজ কোনো মূল্যেই এটা মেনে নেবে না! যারা ছাত্রদের ভবিষ্যতের জন্য কথা বলেছেন তেমন প্রত্যেক প্রতিবাদীর পাশেই আমরা থাকব।’
কী নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের?
ভারতের আইন ও বিচার বিষয়ক সংবাদ ও বিশ্লেষণমূলক ওয়েবসাইট 'লাইভ ল'-এর খবর অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চ বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, এই আদেশ তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে যে, পুলিশের ‘বাড়াবাড়ির’ অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত করা হতে পারে। আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য আদালত একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তবে, কমিটি গঠনের আগে আদালত কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশকে তাদের লিখিত মতামত নথিভুক্ত করার সুযোগ দিয়েছে।
মঙ্গলবার আদালত জানায়, যেসব রাজ্যে সহিংসতা ঘটেছে, তারাও আদালতের সামনে তাদের মতামত জানাতে পারবে। সেই অনুযায়ী, আদালত দিল্লি, মহারাষ্ট্র, বিহার, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্য সচিবদের নোটিশ জারি করে।
এই নির্দেশের উপর ভিত্তি করে কলকাতার ব্যাঙ্কশাল আদালতে আপিল করেন সিজেপির মিছিলে সাংবাদিকদের উপর আক্রমণের ঘটনায় আটকদের আইনজীবী।
মঙ্গলবার দুপুরে ব্যাঙ্কশাল আদালত তাদের দুই দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিলেও সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর ১৬ জনকেই জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। অবশ্য, সুপ্রিম কোর্ট এ-ও নির্দেশ দিয়েছে যে এই বিক্ষোভ সম্পর্কিত সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোন রেকর্ডিং, বেতার যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণ করতে হবে।
আশ্বাস মনে করাল সিজেপি
ককরোচ জনতা পার্টি দাবি করেছে, মোদী সরকার আলোচনায় তাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে বিক্ষোভে জড়িত কোনো ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং সমস্ত এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং বিহারের মতো রাজ্যগুলির সরকারও জানিয়েছে যে প্রতিবাদী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে সামাজিক মাধ্যমে এরকম অনেক পোস্ট এবং ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে পুলিশ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করছে বা জোর করে নিয়ে যাচ্ছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে একটি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘অনেক রাজ্যে পুলিশ ছাত্রদের হয়রানি করছে। সরকারের উচিত ছাত্রদের ভয় দেখানো বন্ধ করা। যদি ছাত্রদের ভয় দেখানো, হুমকি, আটক এবং গ্রেফতার চলতে থাকে, তাহলে ককরোচ জনতা পার্টি আবার একটি ব্যাপক আন্দোলন শুরু করবে। আমরা আবার প্রতিবাদ করব।’
এদিকে, সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে বলেছেন, ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে আলোচনার সময়ে একটি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ‘যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের কথার কোনও মূল্য না থাকে, তাহলে আমি জানি না সরকারের মধ্যে কার কথার মূল্য আছে।’
প্রসঙ্গত, জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রতিবাদে গত জুন মাস থেকে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করে এই ককরোচ জনতা পার্টি। গত ২০ জুলাই তাদের সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পেলেট গান ব্যবহার করলে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা মোদি সরকারের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।-সূত্র: বিবিসি বাংলা
এমএইচআর




