বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

যুদ্ধবিরতি কার বেশি প্রয়োজন, ইরান না যুক্তরাষ্ট্রের?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১১:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

যুদ্ধবিরতি কার বেশি প্রয়োজন, ইরান না যুক্তরাষ্ট্র?
২০২৬ সালের ১৬ জুলাই তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে ইরানের জাতীয় পতাকা হাতে এক ব্যক্তি। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা পঞ্চম দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং এর জবাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দুই দেশই জানিয়েছে, গত জুনে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং আলোচনার জন্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এখন আর কার্যকর নয়। তবে একই সঙ্গে উভয় পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি।

এ অবস্থায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান উভয় দেশকে সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।

প্রকাশ্য বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই পক্ষই আপাতত আপসের তাড়া নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান শান্তিচুক্তির জন্য মরিয়া হলেও ওয়াশিংটন তেহরানকে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অস্তিত্বের লড়াইয়ে’ রয়েছে এবং আগের শান্তি চুক্তি মেনে চলার আর কোনো কারণ নেই।

তবে প্রশ্ন উঠছে- দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা দুই দেশেরই কতটা রয়েছে?

ইরানের সামনে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক চাপ

নিষেধাজ্ঞায় চাপে অর্থনীতি

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর একটি ইরান। কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেন এবং বৈদেশিক সম্পদ দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলারে। একই সময়ে দৈনিক তেল রপ্তানি ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

জুনের সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল। এতে ইরানি রিয়ালের মূল্যও প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করায় অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফিরতে চাপ দিচ্ছে পাকিস্তান

সামরিক সক্ষমতায় ক্ষয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগের দফার হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষণ দিয়েছে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, এপ্রিলের শুরুতেই ইরান তার যুদ্ধ-পূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ হারায়। নৌঘাঁটি, বন্দর, যুদ্ধজাহাজ এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে।

সাম্প্রতিক হামলায় কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন গ্রেটার তুনব দ্বীপসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাও আবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

আঞ্চলিক সম্পর্কেও নতুন সংকট

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আগেই টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। সাম্প্রতিক হামলার পর সেই সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইরান দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তবে আগের দফার সংঘাতে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের ভূখণ্ডেও হামলা এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো পারস্পরিক সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করছে।

আরও পড়ুন: ইরান ‘ভালো আচরণ’ না করলে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বাড়ছে চাপ

তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, তা মে মাসে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছায়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমতও নেতিবাচক হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক ইউগভ জরিপে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। কিছু জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়েও দেখা যাচ্ছে।

অস্ত্রের মজুদ কমছে

সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও সংকটজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও দ্রুত কমে আসছে।

ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সাতটি প্রধান ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের মধ্যে অন্তত চারটির মজুদ প্রথম দফার যুদ্ধেই অর্ধেকে নেমে এসেছে। এসব অস্ত্র পুনরায় উৎপাদনে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এদিকে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৪ জুলাই পর্যন্ত সংঘাতে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও ৪১৪ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধ শেষ করতে কেন ‘হিমশিম খাচ্ছেন’ ট্রাম্প?

যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হতে পারে?

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহর মতে, অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও ইরানের নেতৃত্ব এই সংঘাতকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তেহরান সহজে সমঝোতায় যাবে—এমন সম্ভাবনা কম।

তার ভাষায়, প্রায় ৪৭ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান টিকে থাকার পথ তৈরি করেছে। তাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা কোনো চুক্তিতে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ নিয়ে উদ্বেগ শুধু ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নয়; ভবিষ্যতে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত।

উভয় পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল সংঘাত

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের জন্যই অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।

তবে আলম সালেহর মূল্যায়ন, এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তার মতে, চীন ও রাশিয়া লক্ষ্য করছে যে, বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দ্রুত নতি স্বীকার করাতে পারেনি। এতে বিশ্বের কাছে মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর