শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সীমান্তে বিএসএফকে জমি দিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভের মুখে শুভেন্দু সরকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

সীমান্তে বিএসএফকে জমি দিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভের মুখে শুভেন্দু সরকার

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নিমার্ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জন্য ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে মুর্শিদাবাদ জেলায় তীব্র বাধার মুখে পড়েছে রাজ্য প্রশাসন। কৃষকদের অভিযোগ, তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস এই কৃষিজমি কেড়ে নেওয়া হলে তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন।

পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর মুর্শিদাবাদ জেলা শাখা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ জুন ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ি এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার বিঘা তিন ফসলি জমির ওপর পাঁচটি গ্রামের অন্তত ৬০০ পরিবার কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এসব গ্রাম হলো—দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর ও উত্তর ঘোষপাড়া।

স্থানীয় কৃষকরা এপিডিআরের জেলা কমিটির জানায়, ওই জমির মালিক অধিকাংশই ক্ষুদ্র চাষি, যাদের প্রত্যেকের জমির পরিমাণ এক থেকে দুই বিঘার মধ্যে। পাট, গম, ডাল, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের জীবিকা চলে। নদীভাঙনের কারণে আগেই অনেক জমি হারিয়েছেন তারা, ফলে বর্তমান জমিই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।

এপিডিআরের প্রতিবেদন বলছে, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এখানকার কৃষকেরা এই জমিতে চাষাবাদ করছেন। জলঙ্গী নদীর ব্যাপক ভাঙনে অনেক উর্বর জমি তলিয়ে গিয়েছে। ফলে এই জমির ওপর এলাকার কৃষকদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। মাঠে যেসব কৃষি জমি আছে, তা সবই সরকারি খাতায় নথিভুক্ত। জমিও যথেষ্টই উর্বর…এই জমির ওপর নির্ভরশীল পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবার’।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই জমি অধিগ্রহণ হলে প্রায় তিন হাজার মানুষ জীবিকা হারাবে। ক্ষতিপূরণের অর্থকে কৃষকেরা অপ্রতুল বলে মনে করছেন। তাদের বক্তব্য, জমি দীর্ঘমেয়াদে জীবিকা দেয়, কিন্তু এককালীন অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। 


বিজ্ঞাপন


এদিকে গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলে বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা লাগিয়ে অধিগ্রহণ করতে যায়। এর প্রতিবাদে কৃষকেরা লাঠিসোঁটা ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে এলে কৃষকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকেরা সড়ক ছেড়ে দেন। 

কৃষকরা এপিডিআরকে জানিয়েছে, বিএসএফ কৃষকদের চাষের জমি ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় নিজেদের ক্যাম্প বা অবকাঠামো বানালে তাদের আপত্তি নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোমকল মহাকুমার এই অঞ্চলের জমিতে হিন্দু-মুসলিম এক সঙ্গে চাষ করেন। পাশের গ্রামে হিন্দু এলাকার কৃষকেরাও এই জমি কিছুতেই দেবে না।

হিন্দু গ্রামের অনেকেই জানিয়েছে, নতুন সরকার আসার পর সীমান্ত এলাকার চাষিদের জমি বিএসএফকে দিয়ে দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারা এটা কিছুতেই মানবেন না। বিএসএফ, পুলিশ ক্রমশ এলাকার চাষিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। জমি রক্ষার জন্য তারা লড়াই করবেন।

কৃষকেরা আরও বলেন, গত দুই বছরে বিএসএফ দুবার জমির মাপজোখ করে গেছে। কিন্তু সেই সময়ও কৃষকদের প্রতিরোধের কারণে তারা জমি নিতে আসেনি। এখন আবার জমি নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কৃষকদের অসম্মতিতে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার এই চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।

এদিকে ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এই জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে এপিডিআর দাবি করেছে, জমি নিতে গিয়ে যেভাবে বিএসএফ ও পুলিশ যৌথভাবে প্রতিবাদী কৃষকদের সন্ত্রস্ত করছে, তা চরম অন্যায় ও বেআইনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী এলাকা কার্যত বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সঙ্গে মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তে ‘হোল্ডিং’ বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (আটক কেন্দ্র) নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য চাষের জমি নেওয়া। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কৃষকেরা যাতে মুখ খুলতে না পারেন, সেই লক্ষ্যেই ভয় দেখাতে ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার ভয়ংকর জনবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে’।

মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের আইন অনুযায়ী সন্দেহ হলেই কাউকে দিনের পর দিন আটক রাখা যায় না। হোল্ডিং সেন্টারে বাংলাদেশি সন্দেহে যে সব নাগরিকদের রাখা হয়েছে তাদের সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমকে দেখা করতে দিতে হবে। আটক কেন্দ্রে রাখা নাগরিকদের সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে এবং তাদের মুক্তি দিতে হবে।


এমএইচআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর