শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অভিন্ন আশ্রয়নীতিতে যেসব পরিবর্তন আনল ইইউ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

শেয়ার করুন:

অভিন্ন আশ্রয়নীতিতে যেসব পরিবর্তন আনল ইইউ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন ‘অ্যাসাইলাম ও মাইগ্রেশন প্যাক্ট’ বা অভিন্ন আশ্রয়নীতি গতকাল শুক্রবার থেকে সব সদস্যরাষ্ট্রে কার্যকর হয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে অনুমোদিত এই প্যাক্টের মাধ্যমে ইইউর আশ্রয় ও অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো বহিঃসীমান্তে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, অনিয়মিত অভিবাসনে নিরুৎসাহিত করা, আশ্রয়প্রার্থীদের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও সুষমভাবে বণ্টন করা এবং অনিয়মিতভাবে থাকা ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা।

ব্রাসেলসের মতে, এই প্যাক্টের উদ্দেশ্য হলো ইউরোপের আগের আশ্রয় ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা দূর করা। একই সঙ্গে ইইউর বহিঃসীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে অনিয়মিত প্রবেশ কমানো এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও বেশি ‘সংহতি’ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ২০১৫ সালের মতো ব্যাপক সংখ্যক অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীর আগমনের পরিস্থিতিতে দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন প্যাক্টের প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।

সীমান্তে বাধ্যতামূলক ‘ফিল্টারিং’ প্রক্রিয়া

নতুন এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইইউর বহিঃসীমান্তে একটি বাধ্যতামূলক ‘ফিল্টারিং’ ব্যবস্থা চালু করা। এর লক্ষ্য হলো দ্রুত শনাক্ত করা যে কারা আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা রাখেন এবং কারা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আওতায় পড়তে পারেন।

যেসব ব্যক্তি ভিসা বা বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ছাড়া অনিয়মিতভাবে ইইউর বহিঃসীমান্তে পৌঁছে আশ্রয় আবেদন করবেন, তাদের নিবন্ধন করা হবে এবং পরিচয়, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। এই পর্যায়ে তাদের ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে বলে গণ্য করা হবে না।

তাদের সীমান্তসংলগ্ন অস্থায়ী ট্রানজিট কেন্দ্রে রাখা হবে। গ্রিস, ইটালি ও স্পেনের মতো বহিঃসীমান্তবর্তী দেশগুলোতে এই ফিল্টারিং সীমান্তেই পরিচালিত হবে। অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা সমুদ্রবন্দরে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

ফিল্টারিং প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ সাত দিন স্থায়ী হবে। এরপর আবেদনকারীকে দুটি পদ্ধতির একটিতে পাঠানো হবে: সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়া অথবা দ্রুততর সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়া।

যাদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা পরিসংখ্যানগতভাবে কম, অথবা যাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তাদের দ্রুততর সীমান্ত প্রক্রিয়ায় পাঠানো হবে। তারা সীমান্ত এলাকার অপেক্ষা কেন্দ্রে অবস্থান করবেন এবং ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। এই প্রক্রিয়ায় আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে যাদের সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়ায় পাঠানো হবে, তারা সংশ্লিষ্ট সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে আবেদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের হাতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ২০ মাস সময় থাকবে।

নতুন ‘সংহতি ব্যবস্থা’

প্যাক্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একটি নতুন ‘সংহতি ব্যবস্থা’ চালু করা। যেসব দেশকে ‘অভিবাসন চাপে থাকা দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তারা তাদের আশ্রয়প্রার্থীদের একটি অংশ অন্য সদস্যরাষ্ট্রে স্থানান্তর করতে পারবে। এর উদ্দেশ্য হলো ইটালি ও গ্রিসের মতো প্রথম সারির দেশগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং আশ্রয় আবেদন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আরও ন্যায়সঙ্গতভাবে ভাগ করে নেওয়া।

প্যাক্ট অনুযায়ী প্রতি বছর ন্যূনতম ৩০ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পুনর্বাসনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগেও অনুরূপ পুনর্বাসন ব্যবস্থা ছিল, তবে তা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। নতুন প্যাক্টে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়েছে। তারা চাইলে নির্দিষ্টসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ করতে পারে অথবা অভিবাসন চাপে থাকা দেশগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে পারে।

তৃতীয় দেশে আশ্রয় প্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ

নতুন প্যাক্ট সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে তথাকথিত ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশে’ আশ্রয় প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে। ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশ’ ধারণাটি আগে থেকেই ছিল। এর মাধ্যমে কোনো সদস্যরাষ্ট্র এমন একজন আশ্রয়প্রার্থীকে ওই দেশে পাঠাতে পারত, যিনি সেখানে আগে অবস্থান করেছেন বা দেশটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে।

তবে নতুন প্যাক্ট এই ধারণার পরিধি বাড়িয়েছে। এখন কোনো সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থাকলে একটি নিরাপদ তৃতীয় দেশ এমন আশ্রয়প্রার্থীকেও গ্রহণ করতে পারবে, যার সঙ্গে দেশটির কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে তার আশ্রয় আবেদনও প্রক্রিয়াকরণ করা যেতে পারে। যদিও এই ব্যবস্থা একাকী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া ও ‘রিটার্ন হাব’

অ্যাসাইলাম প্যাক্টের পাশাপাশি নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’ প্রত্যাবর্তনের শর্ত আরও কঠোর করছে।

বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি বহিঃসীমান্তে অবস্থান করছেন এবং যাদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যারা কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করেছেন, অথবা যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তারা ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে বলে গণ্য করা হবে না। তারা সীমান্ত এলাকার অপেক্ষা কেন্দ্রে অবস্থান করবেন এবং সেখান থেকেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

অন্যদিকে সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়ায় থাকা কোনো ব্যক্তি যদি চূড়ান্তভাবে আশ্রয় না পান, তাহলে তাকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে এবং ইইউ ত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি আটক, ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বা পরিচয়পত্র জব্দের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একটি সদস্যরাষ্ট্রে জারি হওয়া দেশত্যাগের নির্দেশ পুরো ইইউ জুড়েই কার্যকর হবে।

এছাড়া সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ইইউর বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবর্তন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এসব কেন্দ্রে এমন ব্যক্তিদের পাঠানো যেতে পারে, যাদের নিজ দেশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে এমন ব্যক্তিদেরও রাখা যেতে পারে, যাদের সঙ্গে ওই দেশের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইউরোড্যাক ডেটাবেজে আরও বেশি তথ্য

এখন পর্যন্ত ইইউতে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করে আশ্রয় আবেদন করা ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সি ব্যক্তিদের আঙুলের ছাপ ইউরোড্যাক ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হতো। নতুন প্যাক্টের আওতায় ইউরোড্যাকের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, যাতে অনিয়মিত চলাচল আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

১২ জুন থেকে ইইউতে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করা সব ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, তারা আশ্রয় আবেদন করুক বা না-করুক। আঙুলের ছাপের পাশাপাশি মুখের বায়োমেট্রিক তথ্যও সংগ্রহ করা হবে।

এর আওতায় থাকবে— ছয় বছর বা তার বেশি বয়সি আশ্রয়প্রার্থী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক, পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ইইউতে আগত ব্যক্তিরা, সাবসিডিয়ারি প্রোটেকশনের সুবিধাভোগীরা, সমুদ্রে এনজিওর মাধ্যমে উদ্ধার হয়ে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসীরা।

ডাবলিন নীতির মূল কাঠামো বহাল

নতুন প্যাক্টের মাধ্যমে আগের ডাবলিন রেগুলেশন বাতিল করা হলেও এর মূল নীতি বহাল থাকছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি প্রথম যে ইইউ দেশে প্রবেশ করবেন, সেই দেশই সাধারণত তার আশ্রয় আবেদন পরীক্ষা করার দায়িত্ব বহন করবে।

তবে নতুন প্যাক্টে পারিবারিক সম্পর্কসহ কিছু অতিরিক্ত মানদণ্ডও গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রথম প্রবেশের দেশ ছাড়া অন্য কোনো সদস্যরাষ্ট্রকেও দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

একটি সদস্যরাষ্ট্র কতদিন আশ্রয় আবেদনের জন্য দায়ী থাকবে, সেই সময়সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে এটি ছিল ১২ মাস, এখন তা ২০ মাস করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি স্থানান্তর এড়াতে পালিয়ে যান, তাহলে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে।

প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তানিয়া রাশো বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এখন কোনো দেশকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফেরত নেওয়ার জন্য আর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠাতে হবে না। শুধু একটি নোটিফিকেশন পাঠানো হবে এবং দেশটিকে বাধ্যতামূলকভাবে তাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।

এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো আশ্রয়প্রার্থীদের এক সদস্যরাষ্ট্র থেকে অন্য সদস্যরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার প্রবণতা বা তথাকথিত ‘সেকেন্ডারি মুভমেন্ট’ কমানো।

আশ্রয়প্রার্থীদের গ্রহণ সংক্রান্ত নতুন নিয়ম

প্যাক্টের ‘রিসেপশন ডিরেকটিভ’ অংশের লক্ষ্য হলো ইইউজুড়ে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম গ্রহণমান নিশ্চিত করা।

এই নির্দেশনা অনুযায়ী সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আবাসন, খাদ্য এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে ডাবলিন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নতুন সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশে ফেরত পাঠানোর নোটিফিকেশন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বস্তুগত গ্রহণ সুবিধা বা সিএমএর অধিকার হারাবেন।

এর উদ্দেশ্য হলো আশ্রয়প্রার্থীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমানো।

ইইউর ভাষ্য অনুযায়ী, “সেকেন্ডারি মুভমেন্ট” ঠেকাতে শুধু যে সদস্যরাষ্ট্র আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকবে, সেই দেশই আবেদনকারীকে গ্রহণসংক্রান্ত সুবিধা দিতে পারবে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস, রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল

এমএইচআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর