ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত সামরিক উপায়ে জোর করে দখল করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, গত ১৯ মে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা শহরে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) সদর দফতরে একটি গোপন বৈঠক করেছিলেন বেশ কয়েক জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা; মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্ষদ জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও উপস্থিত ছিলেন সেই বৈঠকে। এমনকি বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য জেনারেল ড্যান কেইন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটের শরিক রাষ্ট্রগুলোর সেনাপ্রধানদের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকের সূচি কাটছাঁট করেছিলেন বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
বৈঠকে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দ করার জন্য একটি স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন কর্মকর্তারা। কীভাবে সেই অভিযান পরিচালনা করা হবে, তার একটি খসড়া পরিকল্পনাও তৈরি করেন। তারপর জেনারেল ড্যান কেইন সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার খসড়া সমেত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অনুমতি চান।
কিন্তু জেনারেল ড্যান কেইনের এই প্রস্তাব শোনার সঙ্গে সঙ্গে তা বাতিল করে দেন ট্রাম্প। মার্কিন সেনাপ্রধানকে তিনি বলেন, সামরিক উপায়ে ইউরেনিয়ামের দখল নিলে ইরানের তরফ থেকে গুরুতর প্রতিক্রিয়া আসবে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। তাছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন নাগরিক হতাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু প্রকল্পের পাশাপাশি দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনার একটি বড় কারণ। জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ পরিষদ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অথরিটি (আইএইএ)-এর তথ্য অনুসারে, ইরানের কাছে ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। এই ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ বা পরিশুদ্ধ। বিশুদ্ধতার মান ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হলেই এই ইউরেনিয়াম দিয়ে একের পর এক পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে ইরান।
২০২৫ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আইএইএ এই তথ্য জানানোর পর ইরানের ইউরেনিয়াম হস্তগত করতে ওই মাসেই দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। ১২ দিনের সেই অভিযানে ইরানের পরামণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে পারলেও ইউরেনিয়ামের কোনো সন্ধান পায়নি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
চলতি বছর ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে দফায় দফায় ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে সংলাপ হয়েছে; কিন্তু কোনো প্রকার সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে সেই সংলাপ।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রায় ৪০ দিন ধরে যুদ্ধের পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুদ্ধবিরতি এখনও চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, বোমা তৈরির জন্য পরমাণু প্রকল্পের আড়ালে ইরান তার ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে— অন্যদিকে ইরান এ অভিযোগ বার বার প্রত্যাখ্যান করে বলেছে— ইরানের পরমাণু প্রকল্পের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ।
ইরানের এই ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় আছে— তা এখনও রহস্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান, ইরান তার সমৃদ্ধ পরমাণুর মজুত শান্তিপূর্ণ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তান্তর করুক।
সূত্র: সিএনএন
এফএ




