ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যকার মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪ দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির মতো বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হলেও, সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ‘পুশইন’ ইস্যুতে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থানের ফলে এর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার (৮ জুন) দিল্লির লোধি রোডে বিএসএফ সদর দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষ বৈঠক। এই বৈঠকে যে ‘পুশ-ইন’ ইস্যুটি যে গুরুত্ব পাবে, তা আঁচ করা গিয়েছিল। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) লিখিত বক্তব্যে জোরালোভাবে জানিয়েছে, ভারত থেকে জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি, মানবাধিকারবিরোধী এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
বিজ্ঞাপন
তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দাবি করেছে, তারা ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিদের নিজস্ব আইন এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা অনুসরণ করেই ফেরত পাঠাচ্ছে।
মূলত, এই ইস্যুতে মতবিরোধের জেরেই বৈঠক শেষে দুই বাহিনীর মহাপরিচালকরা প্রথা অনুযায়ী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেননি, যা নজিরবিহীন। পরিবর্তে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে দিয়েছে উভয় পক্ষ।
শুক্রবার বিএসএফের প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মতপার্থক্য সত্ত্বেও, উভয় পক্ষ তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি, সমন্বিত সীমান্ত টহল জোরদার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও বিদ্রোহী কার্যকলাপের প্রতি শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়াও সীমান্তে মৃত্যু এবং অনিচ্ছাকৃত বা জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রমের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈঠক শেষে প্রথাগত যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়া এবং প্রেস বিবৃতিতে ‘পুশ-ইন’ কিংবা ‘পুশ-ব্যাক’ বিষয়টির উল্লেখ না থাকা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দুই পক্ষ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সম্ভবত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
এরআগে গত ৩ জুন প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফ জানিয়েছিল, দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠকে একাধিক সীমান্ত-নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে ছিল কাঁটাতার অতিক্রম করে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতে প্রবেশ, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্ত-অপরাধ দমনের মতো বিষয়।
তবে উভয় দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, এসব ইস্যু নিয়ে আলোচনা খুব একটা প্রীতিকর পরিবেশে হয়নি। সীমান্ত-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও কোনো পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি বলে সূত্রগুলোর বক্তব্য।
বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, ‘সীমান্ত আউটপোস্ট দিয়ে কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের 'পুশ-ইনের' মাধ্যমে নয়, বরং অফিশিয়াল প্রোটোকল এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর মেনে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রত্যর্পণ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।’
অন্যদিকে,ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ‘নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য দুই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে সেগুলোর নিষ্পত্তি হয় নি। তাদের ফেরত পাঠাতে আমাদের বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, এই বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। গত মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রথমবার রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং রাজ্য থেকে 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'দের 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তার বক্তব্য, যারা ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতায় পড়েন না, তারা ‘পুরোপুরি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে যে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছেন, তারা ভারতীয় নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। ফলে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই আইনের আওতায় পড়েন না।
শুভেন্দুর এই ঘেষণার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অভিযান চলছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জেলায় জেলায় গড়ে তোলা 'হোল্ডিং সেন্টার'-এ রাখা হচ্ছে।
গত রোববার শুভেন্দু অধিকারী জানান, ইতোমধ্যেই ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ৮৬৩ জনকে রাজ্যের বিভিন্ন 'হোল্ডিং সেন্টার'-এ আটক রাখা হয়েছে।
তবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ উঠছে, যাদের ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে 'পুশ-ইন' করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই কাঁটাতারের মাঝখানে জিরো লাইনে খাদ্য ও পানীয় জল ছাড়া আটকে পড়ে আছেন।
ভারতের পক্ষ থেকে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও, বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। বিজিবির দাবি, চলতি মাসের ৬ জুন পর্যন্ত বিএসএফ ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
সংকট সমাধানে করণীয় কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের এই ‘পুশ-ইন’ সংকট সমাধান এবং উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে দ্রুত কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক স্তরে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই সংকট নিরসনে প্রধান প্রধান করণীয় নির্দেশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ
সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য দুই দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী স্থায়ী ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা, যেটি প্রতি মাসে সীমান্তে পুশ-ইন সংক্রান্ত অভিযোগ ও ডেটা পর্যালোচনা করবে। এর ফলে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের জন্য বড় সমস্যাগুলো জমে থাকবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া
ভারত যাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ দাবি করছে, তাদের তালিকা ও বায়োমেট্রিক তথ্য প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে বাংলাদেশকে সরবরাহ করা। বাংলাদেশ ওই তালিকা পাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক সময়সীমার মধ্যে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন করবে। নাগরিকত্ব প্রমাণিত হলে তবেই আইনি উপায়ে তাদের ফেরত নেওয়া হবে।
রাতের আঁধারে পুশ-ইন বন্ধ
রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক পুশ-ইনের অপচেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। যদি কাউকে ফেরত পাঠাতেই হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন মেনে দিনের আলোয়, বিজিবি-বিএসএফ এবং দুই দেশের স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে করতে হবে।
সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার
স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবি ও বিএসএফের যৌথ টহল আরও জোরদার করতে হবে। রাতের আঁধারে চোরাচালান বা অবৈধ পুশ-ইন ঠেকাতে সীমান্তে আধুনিক নাইট-ভিশন ক্যামেরা এবং ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানো, যার এক্সেস দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছেই থাকবে।
শীর্ষ কূটনৈতিক স্তরে বোঝাপড়া
পুশ-ইন বন্ধে দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রত্যাবাসন চুক্তি’ স্বাক্ষর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ বা রাজ্য রাজনীতির স্বার্থে যাতে সীমান্ত পরিস্থিতিকে ব্যবহার না করা হয়—সে বিষয়ে ঢাকাকে দিল্লির সাথে জোরালো কূটনৈতিক আলোচনা চালাতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ইটিভি ভারত
এমএইচআর




