শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ঢাকা

‘অপ্রতিরোধ্য’ মমতা কেন চরম বিপর্যয়ে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

অপ্রতিরোধ্য’ মমতা কেন চরম বিপর্যয়ে

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির এক মাসের মধ্যেই প্রায় দেড় দশক পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস দলে ভাঙ্গনের চিহ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমনকি দলের ভেতরে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের ফলে দলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্তৃত্বও হুমকির মুখে পড়েছে। 

মূলত, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে এই বিভাজনের শুরু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় বিধানসভায় যাওয়ার সুযোগ হারানোর পর সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনয়ন দেন তিনি। তবে প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তুলেন দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং সন্দীপন সাহা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করেন মমতা। এরপরই দলটির একটি অংশ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন বলে জানা যাচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ যে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন, তার একটা নমুনা হলো গত রোববার মমতা নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে এক বৈঠকে ডেকেছিলেন, কিন্তু সেখানে হাজির হয়েছিলেন মাত্র ২০ জন।

এছাড়াও বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির ২৮ দিন পর প্রথমবার রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন মমতা। সেখানেও তৃণমূলনেত্রী পাশে পেলেন দলের মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন এমপিকে! 

পরবর্তীতে বুধবার বিষয়টি আরও জটিল হয় যখন, দলটির নির্বাচিত ৮০ বিধায়য়কের মধ্যে ৫৮ জন ঋতব্রতকে সমর্থন জানিয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে চিঠি দেন, যা স্পিকার রাথিন্দ্র বোস গ্রহণও করেছেন। বিদ্রোহী এই বিধায়করা নতুন বা আলাদা তৃণমূল কংগ্রেস গড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। 

একইদিনে কলকাতার মেয়র ও মমতার কাছের লোক ফিরহাদ হাকিমও মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, যা মমতার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা। যদিও ফিরহাদ মমতার অনুমতি নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তবে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের একাংশের মধ্যে দলের সিদ্ধান্ত এবং শীর্ষ নেতাদের নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা দলের ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়।


বিজ্ঞাপন


৫৮ বিধায়কের বিদ্রোহের মূল কারণ 

তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী বিধায়করা সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব এবং তার ‘কর্পোরেট স্টাইল’ পরিচালনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, যা দলের ভেতরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারতন্ত্র ও উত্তরাধিকার রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাবকে সামনে এনেছে।

দলটির অনেক নেতা, মুখপাত্র, বিধায়কও ভোটে হারার পর থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সেইসব নেতাদের মধ্যে ছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাও।

image

বিদ্রোহী বিধায়করা পরিষ্কার জানিয়েছেন, তাদের ক্ষোভ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। তারা অভিষেককে পরবর্তী নেতা বা উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, অভিষেক ও তার নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক মিলে তৃণমূলকে একটি কর্পোরেট সংস্থায় পরিণত করেছিল। এর ফলে মাঠপর্যায়ের পুরনো ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অবমূল্যায়ন ও কোণঠাসা করা হয়েছে।

সন্দীপন সাহার মতো নেতারা প্রকাশ্যেই বলেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের রাজপথের লড়াই থেকে উঠে আসা কোনো গণনেতা নন। শুধুমাত্র মমতার আপন ভাতিজা হওয়ার সুবাদে তাকে দলের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় পদ (সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক) দেওয়া হয়েছিল, যা প্রবীণ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দেয়।

বিদ্রোহীদের বড় অংশ মনে করে, মমতার প্রশ্রয়ে অভিষেক দলের ভেতরে একটি সমান্তরাল ক্ষমতা বলয় তৈরি করেছিলেন। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং টিকিট বণ্টন অভিষেকের কার্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো, যা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে। এছাড়াও বিগত বছরগুলোতে দলের ভেতরে হওয়া একাধিক দুর্নীতির দায় অভিষেকের সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত ছিল। তবে মমতার অন্ধ ‘পরিবারতন্ত্র’ প্রীতির কারণে দল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি, যা অবশেষে নির্বাচনে ভরাডুবি ডেকে এনেছে।

নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ কী

নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পেছনে বেশকিছু বড় কৌশলগত কারণ আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো— ইন্ডিয়া জোটে না গিয়ে একা নির্বাচন লড়ার বিষয়ে মমতার অনড় অবস্থান। জোটে না যাওয়ার ফলে বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে গেছে, যার সরাসরি ফায়দা তুলেছে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি।

দ্বিতীয়ত, মুসলিম ভোটের ওপর অত্যাধিক নির্ভরতা। অতীতে মুসলিম ভোটের ৭৫-৮০ শতাংশ তারা পেয়েছে। এবারও তারা ভেবেছিল মুসলিমদের ৮৫-৯০ শতাংশ ভোট পাবে। কিন্তু নতুন দুই দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট ও হুমাহুন কবীরের ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ মুসলিমদের ভোট নিজেদের দিকে নিতে সফল হয়েছে। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কমেছে। অপর দিকে কোনো দল যখন হিন্দু ভোটের ৫৫ শতাংশ পায়, তারা জয়ের কাছাকাছি চলে আসে। এক্ষেত্রে ৬০-৬৫ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হিন্দু ভোট পেয়েছে বিজেপি।

এদিকে এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে যে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

যদিও আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই ক্ষতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা আরো পরিষ্কার বোঝা যাবে, তবে তা সত্ত্বেও এটা বোঝাই যাচ্ছে এই গোটা প্রক্রিয়ায় মোটের ওপর লাভবান হয়েছে বিজেপিই। তবে এই তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক ‘কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে দীর্ঘ ১৫ বছরের দুর্নীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৎ ভাবমূর্তি পুরোপুরি ধ্বংস করেছে এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। একসময় তিনি 'সততার প্রতীক' হিসেবে পরিচিত হলেও একের পর এক কেলেঙ্কারি তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা কেড়ে নিয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে তাদের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজে’র বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ।

তার সঙ্গে এই ১৫ বছরে রাজ্যে তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন চাকরি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভোটের ঠিক আগে বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেও সেই হতাশায় প্রলেপ দেওয়া যায়নি।

মমতার সামনে কি কি পথ খোলা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলত্যাগীদের মতে, বর্তমান সংকট ও নির্বাচনি পরাজয় সামাল দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন একযোগে দলের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। 

এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে তার সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো হলো—

দলের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার: দলের ভেতরের কোন্দল ও ‘পুরনো বনাম নতুন’ দ্বন্দ্ব মেটাতে তাকে অবিলম্বে কঠোর সাংগঠনিক রদবদল করতে হবে।

ইন্ডিয়া জোটে প্রত্যাবর্তন: জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী জোটকে আবার জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের চেষ্টা করা।

আন্দোলনের রাজনীতিতে ফেরা: প্রশাসনিক ক্ষমতা হারানোর পর রাজপথের লড়াকু নেত্রী হিসেবে জনভিত্তি ফিরে পেতে নতুন করে গণআন্দোলন গড়ে তোলা।

দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ছাঁটাই: দলের ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে দুর্নীতি ও বিতর্কে জড়ানো শীর্ষ এবং মেজ স্তরের নেতাদের দল থেকে বহিষ্কার করা।

নতুন মুখ ও তরুণদের প্রাধান্য: যুবসমাজকে আকৃষ্ট করতে দল ও নেতৃত্বে তরুণ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মুখের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।

সূত্র: এনডিটিভি, বিবিসি বাংলা, এবিপি

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর