গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় তিনি একই ভবনে উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ-সমর্থিত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রথমবারের মতো সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক, যা আলী খামেনির নিহত হওয়ার মুহূর্তগুলোর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণ।
বিজ্ঞাপন
সাক্ষাৎকারে আরাঘচি জানান, ২৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা থেকে ফিরে সর্বোচ্চ নেতাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে পরদিন সকালে তার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে খামেনিকে একটি জরুরি ব্রিফিং বা রিপোর্ট দেওয়া।
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার জেনেভা আলোচনা থেকে ফেরার পর, আমি শনিবার সকাল ৯টায় সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে আমার প্রতিবেদন পেশ করতে যাই। আমার প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং যেকোনো মুহূর্তে হামলা হতে পারে।’
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, তিনি কার্যালয়ের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন ঠিক এমন সময় ভবনটিকে লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। তবে তিনি ভবনের অংশে অবস্থান করছিলেন, সেটি সরাসরি বড় ধরনের বোমার আঘাত থেকে কিছুটা বেঁচে যায়। তবে পুরো কমপ্লেক্স ও আশেপাশের এলাকা মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এতে তিনিও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোনোমতে বের হয়ে আসার মুহূর্তটিকে স্মরণ করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যখন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম, তখন আমার সমস্ত চিন্তা শুধু এই দিকেই ছিল যে, সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কি না।’
বিজ্ঞাপন
নিজের নিরাপত্তার কোনো চিন্তা ছিল না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বোমা হামলার মুহূর্তে আমি নেতার জন্য এতটাই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলাম যে নিজের ব্যাপারেও চিন্তিত ছিলাম না।’
For the first time, Iranian Foreign Minister Dr. Abbas Araghchi reveals in an interview with Al Mayadeen the harrowing details of the day the Iranian Leader, Sayyed Ali Khamenei, was martyred.
— Al Mayadeen English (@MayadeenEnglish) June 4, 2026
Araghchi recounts being inside the very same building during the targeted airstrike,… pic.twitter.com/ToJ1wZ1dnT
আরাঘচি জানান, তিনি তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে প্রায় দুই দিন তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে খামেনির খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিজে উদ্ধারকাজের তদারকি করেন। পরবর্তীতে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিশ্চিত জানার পরও আলী খামেনি কোনো সুরক্ষিত আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকার বা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে রাজি হননি।
আরাঘচি বলেন, খামেনি বলেছিলেন, ‘ইরানের প্রতিটি মানুষ যদি নিরাপদ আশ্রয় ও বাঙ্কারে যাওয়ার সুযোগ পায়, তবেই আমি নিরাপদ স্থানে যাব। যেহেতু বর্তমানে সেই সুযোগ সবার জন্য নেই, তাই আমিও জনগণের সঙ্গে মাটির ওপরই থাকব। আমার জনগণের ভাগ্যে যা ঘটবে, আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে।’
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথমদিনে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিহত হন প্রায় ৩৬ বছর ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। একই হামলায় নিহত হন তার পরিবারের আরও অনেক সদস্য। এছাড়াও তার পুত্র ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও এই হামলায় আহত হন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
এদিকে দীর্ঘ তিন মাস পর খামেনির জন্য একটি জাঁকজমকপূর্ণ ও বিশাল রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি বারবার পিছিয়ে গেলেও বর্তমানে পরিস্থিতি বিবেচনায় তেহরান এই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মসজিদে সর্বোচ্চ নেতার মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন শোকসন্তপ্ত ইরানিরা। এরপর ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা আলী খামেনিকে তার জন্মস্থানে, ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে সমাহিত করার কথা রয়েছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদের ইমাম রেজা মাজার ও তার বাবার কবরও রয়েছে।
সূত্র: আল-মায়দিন
এমএইচআর




