আমেরিকান করদাতাদের প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ১৮০ কোটি ডলারের সরকারি তহবিল ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি অভূতপূর্ব চুক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নিজের ব্যক্তিগত করের তথ্য ফাঁসের অভিযোগে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের (আইআরএস) বিরুদ্ধে ট্রাম্পের করা একটি মামলার সূত্র ধরে এই বিশাল অঙ্কের ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড’ বা ‘অস্ত্রায়নবিরোধী তহবিল’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে এই চুক্তির আওতায় ট্রাম্প, তার পরিবার কিংবা তার ব্যবসার অতীতের কোনো করসংক্রান্ত বিষয়ে আইআরএস কোনো আইনি দাবি বা তদন্ত করতে পারবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর ডেমোক্র্যাট, বিভিন্ন জনস্বার্থ রক্ষা কমিটি এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনুসারীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
২০১৯ ও ২০২০ সালে ট্রাম্প এবং তার কোম্পানির স্পর্শকাতর কর বিবরণী ফাঁসের অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যক্তিগত ক্ষমতাবলে আইআরএস-এর বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন ট্রাম্প। একজন সরকারি ঠিকাদার অবৈধভাবে এই তথ্য ফাঁস করেছিলেন, যার বিচারও হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টের নিজের অধীনস্থ একটি সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করা ইতিহাসে বিরল।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে ট্রাম্প এখানে একাধারে মামলার বাদী এবং বিবাদী উভয় পক্ষেই অবস্থান করছেন, যা পুরো আইনি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
চুক্তির একটি অংশে বলা হয়েছে, ট্রাম্প, তার পরিবার, ট্রাস্ট ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অতীতের কোনো কর সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন সরকার আর কখনো কোনো ফৌজদারি মামলা, আইনি দাবি কিংবা অনুসন্ধান চালাতে পারবে না। সমালোচকরা বলছেন, কর তথ্য ফাঁসের মামলার সাথে ট্রাম্পের ব্যবসার অডিট বন্ধ করার কোনো যৌক্তিক আইনি সংযোগ নেই। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো প্রেসিডেন্ট বা নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা আইআরএস-এর চলমান কোনো অডিট বা তদন্ত বন্ধের অনুরোধ করতে পারেন না।
বিজ্ঞাপন
মামলাটি নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে বিচার বিভাগ এই তহবিলটি গঠন করেছে। ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের মতে, অতীতে যারা সরকারের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন, তাদের এই তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এই তহবিলের অর্থ আসবে কংগ্রেসের অনুমোদিত ‘জাজমেন্ট ফান্ড’ বা সরকারি মামলার নিষ্পত্তি তহবিল থেকে, যা মূলত করদাতাদের টাকা। এই তহবিল পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিশন থাকবে, যাদের নিয়োগ ও বরখাস্তের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে খোদ প্রেসিডেন্টের হাতে।
বিরোধীরা এই চুক্তি বাতিলের চেষ্টা করলেও বেশ কিছু প্রক্রিয়াগত প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুতর আইনি ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, মিয়ামি আদালতের বিচারক ক্যাথলিন উইলিয়ামস মামলাটি খারিজ করার সময় উল্লেখ করেছেন যে, আদালতের দাপ্তরিক নথিতে এই সমঝোতা চুক্তির কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড বা শর্তাবলি জমা দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়ত, ফেডারেল আইন অনুযায়ী, সরকার যখন কোনো ‘আসন্ন বা প্রকৃত মামলার’ মুখোমুখি হয়, কেবল তখনই অ্যাটর্নি জেনারেলের সমঝোতা চুক্তি করার এখতিয়ার থাকে। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এখানে কোনো সক্রিয় আইনি বিরোধ অবশিষ্ট নেই।
তৃতীয়ত, সমালোচকদের মতে এই চুক্তি মার্কিন সংবিধানের ‘ইমোলিউমেন্টস ক্লজ’ বা পারিতোষিক ধারা লঙ্ঘন করে, যা প্রেসিডেন্টকে তার নির্ধারিত বেতনের বাইরে সরকারের কাছ থেকে অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা নিতে বাধা দেয়। তবে সাধারণ করদাতাদের এই চুক্তিকে সরাসরি আদালতে চ্যালেঞ্জ করার আইনি অধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের কারণে বেশ সীমিত।
মার্কিন বিচার বিভাগ এই তহবিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ওবামা আমলের ‘কিপসিগল বনাম ভিলস্যাক’ মামলার উদাহরণ টেনেছে, যেখানে আদিবাসী খামারিদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগে ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হয়েছিল।
তবে কিপসিগল মামলার আইনজীবীরা বলছেন, দুটি ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওবামা আমলের তহবিলটি আদালতের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের জন্য গঠিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই চুক্তিতে আদালতের কোনো নজরদারি নেই এবং এর সুবিধাভোগীদের সাথে মূল মামলার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।—সূত্র: সিএনএন
/একেবি/




