পশ্চিমবঙ্গের ১৮তম বিধানসভার প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে আজ শুক্রবার। এই প্রথমবার ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় অধিবেশনের কার্যক্রম। তবে অধিবেশন শুরুর সেই গাম্ভীর্য স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। বিজেপি ও তৃণমূল বিধায়কদের স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিধানসভা। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের এক পর্যায়ে স্পিকার নির্বাচন শুরুর আগেই ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়করা।
এদিন অধিবেশন শুরু হতেই ট্রেজারি বেঞ্চ তথা শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে ‘ভারত মাতা কী জয়’ স্লোগান উঠতে থাকে। পাল্টায় বিরোধী বেঞ্চ থেকে তৃণমূল বিধায়করা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন বিজেপি বিধায়করা ‘চোর চোর’ এবং ‘ফাইল চোর মমতা’ স্লোগান শুরু করেন। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে তৃণমূল বিধায়করা ‘ভোট লুটের’ অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন।
বিজ্ঞাপন
এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে তৃণমূল বিধায়করা একযোগে কক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে স্পিকার নির্বাচনের সময় বিধানসভা কক্ষ বিরোধীশূন্য হয়ে পড়ে। যদিও কয়েক মিনিট পর ফের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন দলের বিধায়করা।
এতকিছুর মধ্যেই অধিবেশন কক্ষে স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায় সরকার পক্ষ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারিভাবে কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক রথীন্দ্রনাথ বসুর নাম স্পিকার পদের জন্য প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাবকে সমর্থন (সেকেন্ড) করেন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। শেষমেশ স্পিকার নির্বাচিত হন রথীন্দ্রনাথ বোস।
নবনির্বাচিত স্পিকার রথীন্দ্রনাথ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন। বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গঠনমূলক বিরোধিতা চাই। বিধানসভা মারামারির জায়গা নয়। বিধানসভায় সরকার ও বিরোধী পক্ষ সমানভাবে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবে’।
এরপর বিরোধীদলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নতুন স্পিকারকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন। মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, ‘বিধানসভায় অনেক নাটক দেখা গেল। অতীতে যারা প্রায় প্রতিদিন অধিবেশন বয়কট করতেন, আজ তারাই গণতন্ত্র ও বিধানসভা পরিচালনা নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছেন’।
বিজ্ঞাপন
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘ভয় চলে যাবে, ভরসা আসবে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ মানুষের মধ্যে ভরসা নেই, বরং ভয় আরও বেড়েছে। বহু মানুষ ঘরছাড়া।’
শোভনদেব আরও দাবি করেন, হামলার শিকার তৃণমূল কর্মীরা পুলিশের কাছে গেলে তাদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। বরং পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই অন্যভাবে অভিযোগ লিখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ঘরছাড়া তৃণমূল কর্মীদের নিরাপদে ঘরে ফেরানোর আবেদন জানান।
বিরোধী দলনেতার বক্তব্যের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘কেউ ঘরছাড়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তারা ঘরছাড়া হয়ে থাকলে পুলিশ তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দেবে। তবে ২০১১ সালের ভোট-পরবর্তী সহিংসতার সঙ্গে যাদের যোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এরপর বক্তব্য রাখেন বিজেপি বিধায়ক ও প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভার প্রথম দিনেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের এই চরম সংঘাত ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে বিধানসভার অন্দরে লড়াই আরও তীব্র হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘বন্দেমাতরম’ দিয়ে অধিবেশন শুরু এবং স্লোগান যুদ্ধের এই ঘটনা রাজ্যের সংসদীয় সংস্কৃতিতে এক নতুন মেরুকরণের ছবি স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এমএইচআর




