ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নৃশংস যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার যৌথভাবে এই আইনি প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দেন।
গত সোমবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফের লেখা ‘দ্য সাইলেন্স দ্যাট মিটস রেপ অব প্যালেস্তাইনিয়ানস’ নামে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ইসরায়েলের ‘এসডি তেমান’ আটক কেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে ক্রিস্টফ অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, বসতি স্থাপনকারী, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেটের জিজ্ঞাসাবাদকারী এবং সর্বোপরি কারারক্ষীদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি পুরুষ, নারী এমনকি শিশুদের ওপরও পদ্ধতিগতভাবে ব্যাপক যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে।

প্রতিবেদনটি ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ১৪ জন নারী-পুরুষের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যারা জানিয়েছেন যে তারা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বা সৈন্যদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটিকে ‘আধুনিক গণমাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশিত এযাবৎকালের সবচেয়ে জঘন্য ও বিকৃত মিথ্যাগুলোর একটি’ বলে অভিহিত করেছে।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রণালয় বলেছে, হামাস গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার সময় যে পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতা চালিয়েছিল—সে সংক্রান্ত ইসরায়েলের একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক আগেই নিউইয়র্ক টাইমস উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসরায়েলি সেনাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এই মিথ্যা নিবন্ধটি প্রকাশ করেছে।
তবে মামলার হুমকির মুখেও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফিলিস্তিনি সাবেক বন্দীরা এর আগেও ইসরায়েলি হেফাজতে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গত মাসেও অধিকার রক্ষা সংস্থা ইউরো-মেডিটেরিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের সংগৃহীত সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই)।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজা থেকে আটক করা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ইসরায়েলের কারাগারে ভয়াবহ যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানোর এই নিষ্ঠুর অপরাধের পেছনে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামরিক এবং বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সমর্থন রয়েছে। বন্দিদের ওপর চালানো এসব নির্যাতনের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কুকুর এবং বিভিন্ন বস্তু ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো চরম জঘন্য কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে আটক হওয়া ৪২ বছর বয়সী এক নারী বন্দি তার দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছেন, তাকে কুখ্যাত এসডি তেইমান আটক কেন্দ্রে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় একটি ধাতব টেবিলের সঙ্গে বেঁধে দুই দিন ধরে মুখোশধারী সেনারা বারবার ধর্ষণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজের মৃত্যু কামনা করেছিলাম’ এবং জেলখানার দেয়ালের আড়ালে চলা এই বীভৎসতাকে তিনি ‘আরেকটি গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নির্যাতনের সময় সেনারা ভিডিও ধারণ করত এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চলত।

আমির নামে ৩৫ বছর বয়সী এক সাবেক বন্দি জানিয়েছেন, সেনাদের নির্দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর তাকে যৌন নির্যাতন ও মারাত্মক শারীরিক আঘাত করেছে, যা তার কাছে ছিল চরম অবমাননাকর।
ইউরো-মেড-এর মাঠ পর্যায়ের গবেষক খালেদ আহমেদ জানিয়েছেন, এসব অপরাধ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার একটি সুনির্দিষ্ট ধরণ যা বন্দিদের মর্যাদা, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
বন্দিদের কমিশনের আইনজীবী খালেদ মাহাজনা একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, এসডি তেইমান কারাগারে এক বন্দির ওপর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নজল ব্যবহার করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়েছে, যার ফলে তার শরীরে অভ্যন্তরীণ মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলি চিকিৎসা কর্মী ও বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো এই অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা নির্যাতনের চিহ্ন আড়াল করছেন এবং বিচার বিভাগ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিটিও এর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণকে দমন ও ধ্বংস করার জন্য যৌন সহিংসতাকে ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এনেছিল।
গবেষকদের মতে, এই ট্রমা কেবল ভুক্তভোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাদের পরিবার এবং রক্ষণশীল ফিলিস্তিনি সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সূত্র: আলজাজিরা, মিডল ইস্ট আই
এমএইচআর




