ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি (২৭) ও জামিল লিমন (২৭) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেন্ট পিটার্সবার্গের উত্তর উপকূলে কায়াক (ছোট নৌকা) চালিয়ে মাছ ধরার সময় এক জেলে একটি দুর্গন্ধযুক্ত কালো ময়লার ব্যাগ শনাক্ত করেন। ব্যাগের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে নাহিদা বৃষ্টির নিথর দেহ। হিলসবোরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
শেরিফ ক্রনিস্টার জানান, ওই কায়াকচালক মাছ ধরার সময় তার ছিপের সুতা একটি ঝোপের মধ্যে আটকে যায়। সুতা ছাড়াতে তিনি যখন ঝোপের ভেতর প্রবেশ করেন, তখন তীব্র দুর্গন্ধ পান। প্লাস্টিকের ব্যাগটি খোলা ছিল এবং ভেতরে লোনাপানি প্রবেশ করছিল। তিনি বুঝতে পারেন, ভেতরে মানুষের দেহাবশেষ রয়েছে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানান এবং তারা এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
বিজ্ঞাপন
মরদেহটিতে পচন ধরে যাওয়ায় ডিএনএ ও দাঁতের রেকর্ড নিয়ে পরীক্ষা করতে হয় তদন্তকারীদের। তবে নিখোঁজ হওয়ার সময় বৃষ্টি যে পোশাক পরেছিলেন, মরদেহে সেই ধরনের পোশাক ছিল। এটি দেখে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয় মরদেহটি বৃষ্টির।
হত্যাকাণ্ডের শিকার নাহিদা বৃষ্টি ও জামিল লিমন উভয়ই বাংলাদেশি এবং ইউএসএফে স্টুডেন্ট ভিসায় পড়াশোনা করছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল বৃষ্টিকে সর্বশেষ দেখা যায় এবং পরের দিন ইউএসএফ পুলিশকে তার নিখোঁজ হওয়ার কথা জানানো হয়।
লিমনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায় ১৮ এপ্রিল। লিমনের অ্যাপার্টমেন্টের দুই রুমমেটের মধ্যে একজন তদন্তকারীদের কিছু তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। তিনি জানান, তাদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজার ম্যাট এবং কিছু জিনিস নিখোঁজ রয়েছে। পরে পুলিশ অ্যাপার্টমেন্টের আবর্জনার স্তূপ থেকে লিমনের চশমা, আইডি কার্ড, মানিব্যাগ এবং রক্তমাখা কাপড় উদ্ধার করে।
এরপর ফরেনসিক প্রযুক্তির সহায়তায় লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে রান্নাঘর এবং অভিযুক্ত হিশাম আবুঘারবিয়েহর (২৬) বেডরুমে প্রচুর রক্তের দাগ পাওয়া যায়। শেরিফ ক্রনিস্টার বলেন, ‘আমরা নিখুঁত প্রযুক্তির সাহায্যে বিছানার পাশে মেঝের ওপর পড়ে থাকা ক্ষুদ্র আকৃতির একটি মানবদেহের ছাপ শনাক্ত করি।’
বিজ্ঞাপন
চ্যাটজিপিটি ব্যবহার ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহ তার ফোন থেকে সব ডেটা ডিলিট করলেও তদন্তকারীরা তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। ফোনের সার্চ হিস্ট্রি এবং চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তার কথোপকথন থেকে ভয়ংকর সব পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। সে চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিল— একটি ছুরি খুলি ভেদ করতে পারে কি না, প্রতিবেশীরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে কি না এবং কোনো মরদেহ ময়লার ব্যাগে ভরে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া যায় কি না। ক্রনিস্টার বলেন, ‘এই সার্চগুলো করা হয়েছিল দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজের কয়েক দিন আগে। এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড।’
মরদেহ গুম ও গ্রেফতারের ঘটনা
তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন, আবুঘারবিয়েহ তার গাড়ির ট্রাংকে করে নাহিদা বৃষ্টির মরদেহ নিয়ে গিয়েছিল। লিমনের মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশে একটি ব্যাগের ভেতর। লিমনকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় এবং ব্যাগটিতে মরদেহ যাতে সহজে ধরে, সে জন্য তাঁর পা প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
২৪ এপ্রিল, যখন লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়, সে সময় আবুঘারবিয়েহর পরিবার থেকে হিলসবোরো শেরিফের অফিসে ফোন করে তার ও তার বোনের মধ্যে পারিবারিক কলহের কথা জানানো হয়। পুলিশ বাড়িতে গিয়ে তাকে আত্মসমর্পণ করতে বললে তিনি প্রথমে অস্বীকৃতি জানান। পরে সোয়াট টিম অভিযানের প্রস্তুতি নিলে তিনি বেরিয়ে আসেন।
গ্রেফতারের পর প্রাথমিকভাবে হিশামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, অবৈধভাবে বন্দী রাখা, তথ্যপ্রমাণ লোপাট, মৃত্যুর খবর না দেওয়া এবং বেআইনিভাবে মরদেহ সরানোর মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। পরদিনই তার বিরুদ্ধে দুটি ফার্স্ট ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ আনা হয়। আদালতের শুনানিতে বিচারক তাকে জামিনবিহীন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ এখনো হত্যাকাণ্ডের মোটিভের সন্ধানে
হিলসবোরো স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ এবং ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, আবুঘারবিয়েহ চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে অপরাধের পরিকল্পনা করায় এর পেছনে কোম্পানির কোনো দায়বদ্ধতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোম্পানিটি তদন্তে সহযোগিতা করছে।
শেরিফ ক্রনিস্টার বলেন, ‘আমরা সত্যের পাশাপাশি এর পেছনের কারণ বা মোটিভ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, যা এখনো রহস্যময়। নিহত ব্যক্তিদের রুমমেটরা জানান, আবুঘারবিয়েহর আচরণ ছিল খুবই অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক। তারা ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।’
এফএ




