বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে রেকর্ড সংখ্যক ভোটদানের নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ। বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ভোটের হার প্রায় ৯০ শতাংশ, যা ২০১১ সালের পর থেকে সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আজ প্রথম দফায় ১ টি জেলার ১৫২টি আসনে গড় ভোট পড়েছে ৮৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ, তার মধ্যে সাতটি জেলাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশের বেশি। এরমধ্যে সবথেকে বেশি ভোট পড়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় – ৯৩.১২ শতাংশ। এরপরেই আছে কুচবিহার জেলা। সেখানে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৯২ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
এর আগে আসনওয়ারি ভোটদানের যে হার প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে সর্বশেষ, বিকেল তিনটা পর্যন্ত ১৫২টি আসনের যে ভোটদানের হারের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ আসনটিতেই সবথেকে বেশি ভোট পড়েছে– প্রায় ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
যে আসনে দ্বিতীয় সর্বাধিক ভোট পড়েছে, সেই রঘুনাথগঞ্জে ভোট দানের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। মুসলমান অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায় ভোটদানের হার কোথাও ৮৫, কোথাও ৮৪ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী যে ১৫২টি আসনে বৃহস্পতিবার ভোট নেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে ৫৪টি আসনে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছে। বিকেল তিনটের মধ্যে ৭৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে, এমন আসন রয়েছে ৮০টিরও বেশি। সবথেকে কম ভোট যে আসনে পড়েছে, সেই পুরুলিয়া আসনেও ভোটদানের হার ৭২ দশমিক ২২ শতাংশ।
এদিকে রেকর্ড পরিমাণে ভোটের নেপথ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর আতঙ্ক।
বিজ্ঞাপন
প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পর্যবেক্ষণকরী সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বলেন, ‘এত বছর ধরে ভোট দেখছি, সবসময়েই দেখেছি যে গরমের কারণে হয় খুব সকালে, নয়তো রোদ পড়ে আসার পরে – আড়াইটে-তিনটে থেকে ভোটারদের লাইন বড় হতে থাকে। কিন্তু এবার দেখছি সকাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে ভোট দানের হার বেড়ে চলেছে’।
যেসব অঞ্চল ভোটের দিনে অস্থিরতার জন্য একেবারে চিহ্নিত, সেখানে এবার বিশৃঙ্খলা তেমন হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সামান্য হাতাহাতি, ধাওয়া করা, কয়েকটা বোম পড়া – এসব তো একেবারেই তুচ্ছ। এর একটা অর্থ হচ্ছে মানুষ ‘এবার ভোটটা দিতেই হবে’ – এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। এসআইআর নিয়ে যা হয়েছে, তারপরে ভোটার তালিকায় নাম থাকা কেউ আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলেই মনে হচ্ছে”।
কলকাতার সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’এর গবেষক সাবির আহমেদ বলেন, ‘মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলমান অধ্যুষিত আসনগুলোতে প্রচুর সংখ্যক ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। অথচ আমরা বিগত নির্বাচনগুলোয়, এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দেখেছি যে ওই অঞ্চলে নারীদের ভোট দানের হার বেশি – পুরুষদের তুলনায়। এর একটা কারণ হলো বড় সংখ্যক পুরুষ তো পরিযায়ী শ্রমিক – তাদের মধ্যে বহু মানুষ ভোট দিতে বাড়িতে আসেনই না’।
তিনি আরও বলেন, ‘এবারে নারী আর পুরুষদের ভোটদানের হার যদিও এখনো প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন, তবে এত বেশি ভোট দানের হার দেখে মনে হচ্ছে বহু সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক পুরুষও ফিরে এসেছেন ভোট দেওয়ার জন্যই। আবার অন্যান্য জেলাতেও দেখা যাচ্ছে যে সকাল থেকেই ভোটদানের হার বেশিই থেকেছে। আমাদের মনে হচ্ছে এসআইআর নিয়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মানুষের মনে, ভোটদানের এই হার দেখে মনে হচ্ছে মানুষ এবার নিশ্চিত করতে চাইছেন যাতে তারা ভোট দিতে পারেন।’
পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুকও বলছিলেন যে এসআইআরের প্রেক্ষিতেই এবারের ভোট দানের হার বেশি হয়েছে।
তার কথায়, ‘এসআইআরের পরে যাদের নাম ভোটার তালিকায় থেকে গেছে, তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন যে এবারের ভোটটা দিতেই হবে। একটা প্রমাণ রাখার তাগিদ আমরা দেখছি মালদা – মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে। কখনও দেখিনি যে ভোটার স্লিপের ফটোকপি করে রাখছেন মানুষ, এবারে সেটাও করেছেন তারা – যাতে পরবর্তীতে প্রমাণ করা যায় যে এসআইআরের পরে তার নাম ভোটার তালিকায় ছিল এবং তিনি ভোট দিয়েছেন’।
তিনি বলেন, ‘আবার বহু মানুষ, যারা ভিন রাজ্যে কাজ করেন, তারা বড় সংখ্যায় ফিরে এসেছেন যাতে ভোট দেওয়া যায়। এসআইআরের ভয়ই কাজ করেছে এত বেশি ভোট দানের হারের পেছনে।’
সূত্র: আনন্দবাজার, বিবিসি বাংলা
এমএইআর




