যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কেন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’।
রোববার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে চীনের উন্নত স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন আধিপত্যের অবসান
দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশ থেকে তোলা উচ্চমানের ছবির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মার্কিন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলো সাংবাদিক ও গবেষকদের তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এই শূন্যস্থান দ্রুত দখল করে নিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে চীনের কাছে ৬৪০টিরও বেশি রিমোট-সেন্সিং স্যাটেলাইট রয়েছে, যার মধ্যে কেবল ২০২৫ সালেই ১২০টি উৎক্ষেপণ করেছে তারা।
ইরানের হাতে উন্নত প্রযুক্তি
গত সপ্তাহে ব্রটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান গোপনে একটি চীনা গুপ্তচর স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে। ওই স্যাটেলাইটটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর তথ্য দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, টিইই-০১বি নামের স্যাটেলাইটটি চীনা কোম্পানি আর্থ আই কো’র তৈরি। এটি তারাই উৎক্ষেপণ করেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীন থেকে মহাকাশে পাঠানো হয় এবং পরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অ্যারোস্পেস ফোর্স এটি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি বলছে, ইরানের সামরিক কমান্ডাররা এই স্যাটেলাইটকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো নজরদারির নির্দেশ দেন। নির্দিষ্ট সময় ও স্থানাঙ্কসহ তালিকা, স্যাটেলাইট ছবি এবং কক্ষপথ বিশ্লেষণের তথ্য এতে রয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আরও জানায়, মার্চ মাসে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে ওই সব স্থানের ছবি তোলা হয়েছিল। সেই সূত্রই বড় সাফল্য এনে দেয় ইরানকে।
এছাড়া ‘চায়না সিওয়েই’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মার্কিন সামরিক অবস্থানের হাই-রেজোল্যুশনের ছবি সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শতাধিক স্যাটেলাইট নিয়ে গঠিত চীনের ‘জিলিন-১’ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক পৃথিবীর যে কোনো স্থানের ছবি প্রতি ১০ মিনিটে একবার তুলতে সক্ষম হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা মার্কিন প্রযুক্তির চেয়েও দ্রুততর।
এআই এবং ভিডিও প্রযুক্তির ব্যবহার
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ছবিই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অস্পষ্ট ছবি থেকেও নিখুঁত তথ্য বের করে আনছে। ‘মিজারভিশন’-এর মতো কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা আমেরিকার প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স ব্যাটারি এবং যুদ্ধবিমানের অবস্থান এআইয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করে প্রকাশ করছে। এছাড়া ভিডিও ধারণ সক্ষমতায় চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তাদের ‘জিলিন-১’ এবং ‘জুহাই-১’ স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে সরাসরি ভিডিও রেকর্ড করতে সক্ষম।
জিপিএস-এর বিকল্প ‘বেইডু’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী- ইরান তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনায় মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ‘জিপিএস’ এর পরিবর্তে চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ‘বেইডু’ (BeiDou) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। যদিও দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তির প্রমাণ মেলেনি।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ইরান এই উন্নত স্যাটেলাইট সংকেত প্রযুক্তিকে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থায় অভিযোজিত করে নিয়েছে।
পশ্চিমা জ্যামিং এড়ানোর কৌশল
অতীতে মার্কিন জিপিএস ব্যবহারের সময় যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র দেশগুলো প্রায়ই ইলেকট্রনিক ‘জ্যামিং’-এর মাধ্যমে ইরানের ড্রোনগুলোকে লক্ষ্যচ্যুত করতে সক্ষম হতো। কিন্তু চীনের বেইডু সিস্টেম ব্যবহারের ফলে সেই ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে গেছে। যেহেতু এই স্যাটেলাইট ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতে নেই, তাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির নির্ভুলতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা নিয়ে বিশ্লেষণ
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের নতুন প্রজন্মের ড্রোনগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আঘাত করতে পারছে। তবে এই নির্ভুলতার নির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তিগত মান (যেমন সেন্টিমিটার-লেভেল প্রিসিশন) সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের এই গুণগত মান বৃদ্ধি পশ্চিমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
ধীর গতির এক কৌশলগত পরিবর্তন
প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরান ও চীনের মধ্যে এই প্রযুক্তিগত সম্পর্ক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রবণতা। চীন সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী হলেও তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিনিময়ের মাধ্যমে ইরানকে এক ধরনের ‘কৌশলগত সুবিধা’ প্রদান করছে। এই নীরব প্রযুক্তিগত বিনিময় মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
এমএইচআর




