বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ফেরত চায় ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ফেরত চায় ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবিটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, আর তা হলো— বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটক ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি। ১৯৭৯ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ওয়াশিংটনের কঠোর পদক্ষেপের কারণে তেহরানের তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির এসব অর্থ বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জব্দ রয়েছে।

ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ

বিভিন্ন দেশে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের সঠিক পরিমাণ অস্পষ্ট হলেও, কিছু ইরানি প্রতিবেদন অনুযায়ী এর মোট পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি— যা দেশটির জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অংক আরও অনেক বেশি হতে পারে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসী সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ হাইড্রোকার্বন বিক্রি করে তেহরানের বার্ষিক আয়ের প্রায় তিনগুণ। 

তিনি বলেন, ‘এটি একটি বিশাল অংক, বিশেষ করে এমন একটি সমাজের জন্য যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়ে আসছে।’

জব্দকৃত সম্পদ বলতে কী বোঝায়? 

যখন কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ বা কোনো বৈশ্বিক সংস্থা কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা অন্য কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পত্তি, তহবিল সাময়িকভাবে আটক করে, তখন তাকে ‘সম্পদ জব্দকরণ’ বলা হয়। আদালত, অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি কোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানও সম্পদ জব্দ করতে পারে। 

নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মতো কারণগুলো মালিকের এই সম্পদগুলো বিক্রি করে তা থেকে লাভ করার ক্ষমতাকে সীমিত করে। 

দেশগুলো দাবি করে যে তারা অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অর্থ পাচার বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে অন্যান্য দেশ, ব্যক্তি বা কোম্পানির সম্পদ জব্দ করে। কিন্তু সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন- এই পদক্ষেপটি প্রায়শই বেছে বেছে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে পশ্চিমারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের লক্ষ্যবস্তু করতে। 

ইরান ছাড়াও রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া এবং কিউবার মতো আরও কয়েকটি দেশের সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো জব্দ করেছে। 

ইরানের সম্পদগুলো কোথায় জব্দ করা হয়েছে? 

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ইরাক ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে ইরানের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ঠিক কী পরিমাণ, কোথায় এবং কী পরিমাণে সম্পদ জব্দ করা হয়েছে তা অজানা থাকলেও আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুসারে, জাপানে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার, চীনে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইরাকে ৬ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত ইরানি সম্পদ রয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র এবং লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছেও যথাক্রমে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এবং প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সরাসরি জব্দকৃত ইরানি সম্পদ রয়েছে। 

এছাড়াও, কাতারের কাছেও প্রায় ৬০০ কোটি ডলার রয়েছে। তবে সেই অর্থ ইরানকে পরিশোধ করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরানো হয়েছিল, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র আটকে দেয়।

ইরানের তার জব্দকৃত সম্পদ প্রয়োজন কেন

গত ১০ এপ্রিল পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বসতে রাজি হওয়ার আগেই ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এক্স-এ একটি পোস্টে বলেন, যেকোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবশ্যই মুক্ত করতে হবে।

এক দিন পর, ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওয়াশিংটন ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে, কিন্তু মার্কিন সরকার দাবিগুলো নাকচ করে দেয়। আগামী দিনগুলোতে পরবর্তী দফার আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, এই বিষয় নিয়ে মতবিরোধটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

কয়েক দশক ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই সংকটে ছিল। এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেল বাণিজ্যকে সীমিত করে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তির আধুনিকীকরণের ক্ষমতাকে সংকুচিত করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন এবং ইরানি রিয়ালের মূল্যহ্রাস দেশটির সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা যুদ্ধের সময় অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। 

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ডিরেক্টর এবং ইরান বিষয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক রোক্সান ফারমানফারমাইয়ান আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা হলে তা দেশটির জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, ‘এর অর্থ হবে, উদাহরণস্বরূপ, তেল বিক্রি থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্জিত তহবিল নিজেদের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে পারা। এটি দেশটিকে তার মুদ্রার ওঠানামার ওপর নিয়ন্ত্রণ দেবে এবং এর ফলে মুদ্রার আকস্মিক পরিবর্তনের ঝুঁকি এড়ানো যাবে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দেশটির সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।’

জব্দকৃত তহবিলে প্রবেশাধিকার পেলে তা প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে, জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক উন্নত করবে এবং নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে আসা দুর্নীতি নির্মূলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু করবে।

সূত্র: আলজাজিরা, এনডিটিভি

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর