যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধবিরতির সব শর্ত কিংবা দাবি মেনে নেওয়া না হলে ইরানে আজকেই একটি সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এমন হুমকির পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই পারমাণবিক হামলার দিকে এগোচ্ছে?
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’
বিজ্ঞাপন
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি চাই না এমনটা ঘটুক, কিন্তু সম্ভবত তাই ঘটবে। তবে, এখন যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ ও সার্বিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে ভিন্ন, অধিকতর বুদ্ধিমান এবং কম উগ্রপন্থী মানসিকতার মানুষেরা প্রাধান্য পাচ্ছে, হয়তো বৈপ্লবিকভাবে চমৎকার কিছু একটা ঘটতে পারে।’
পোস্টের শেষে তিনি বলেছেন, ‘কী হবে কে জানে? আমরা আজ রাতেই তা জানতে পারব, যা বিশ্বের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। ৪৭ বছরের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং মৃত্যুর অবসান ঘটবে। ইরানের মহান জনগণের মঙ্গল হোক!’
ট্রাম্পের এই বার্তার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মন্তব্য করেন, মার্কিন বাহিনীর হাতে এমন কিছু অস্ত্র রয়েছে, যা এখনো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘তাদের (ইরান) জানা উচিত, আমাদের হাতে এমন সব ব্যবস্থা রয়েছে; যা আমরা এ পর্যন্ত ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সেগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং ইরানিরা যদি তাদের আচরণের ধারা পরিবর্তন না করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সেগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবেন।’
তার এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও ট্রাম্প বা ভ্যান্স সরাসরি ‘পারমাণবিক হামলা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তার বক্তব্যের তীব্রতা এবং ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ সংক্রান্ত ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এমন ভাষা সাধারণত ধ্বংসাত্মক সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়, যা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেয় না। কারণ একটি পুরো ‘সভ্যতা’ এক রাতে ধ্বংস করার সামর্থ্য কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব।
তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, যা পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করে।
ট্রম্পের এমন হুঙ্কার তার দিন দিন আরও ‘ক্ষুব্ধ ও বেপরোয়া’ হয়ে ওঠারই লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান।
তিনি বলেছেন, “ইরানের একটি ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবশেষ হুমকি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তিনি ইরানের ওপর ‘আরও রাগান্বিত ও হতাশ’ হয়ে পড়েছেন। ইরানকে চুক্তিতে না আনতে পেরে ট্রাম্পের সুর দিন দিন আরও কঠোর হচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে তিনি সমস্যায় পড়েছেন।”
ইরানি এই অধ্যাপক বলেন, ট্রাম্প নিজের সব হুমকি বাস্তবায়ন করতে না পারলেও ইরানকে আরও কঠোরভাবে আঘাত করার ক্ষমতা রাখেন। আর তেহরানও এর সমুচিত জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
আহমাদিয়ান আরও বলেন, ‘এটি এক ভয়াবহ চোরাবালি; যা যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই তৈরি হয়েছিল। নিজের কোনও লক্ষ্য অর্জন করতে না পেরেই ট্রাম্প এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।’
এদিকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই হামলার খবর পাওয়া গেল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, দেশটির একজন উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন- এই হামলায় শুধু ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, কোনো তেল স্থাপনায় নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স খার্গ দ্বীপে সর্বশেষ হামলার কথা স্বীকার করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের প্রতি মঙ্গলবার রাত ৮টার (ইটি) সময়সীমার আগে এই হামলা ‘কৌশলে কোনো পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত দেয় না।
খার্গ দ্বীপে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
ইরানে আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বীপটিতে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্র: আলজাজিরা, সিএনএন
এমএইচআর

