পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। সোমবার গভীর রাতে ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত জেলা-ভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯০ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাদের সিংহভাগই মুসলিম বলে উঠে এসেছে একটি সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায় মোট ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারকে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জনের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রথম চূড়ান্ত তালিকাতেই ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম বাদ পড়েছিল। ফলে সব মিলিয়ে বাদ পড়া নামের সংখ্যা ৯০ লাখের গণ্ডি পেরিয়ে গেল। যদিও তৃণমূল সভানেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাবে।
জেলা অনুযায়ী পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মুর্শিদাবাদেই সবচেয়ে বেশি ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৩৭ জনের নাম বাদ পড়েছে। তার পরেই রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা (৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৬৬) এবং মালদহ (২ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৫)। এই তিন জেলাতেই ছাঁটাইয়ের মাত্রা তুলনামূলক বেশি।
তবে এখনও প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি বলেই জানিয়েছে কমিশন। বিবেচনাধীন তালিকার ৫৯ লাখ ৮৪ হাজার ৫১২ জনের তথ্য প্রকাশিত হলেও, প্রায় ২২ হাজারের বেশি ক্ষেত্রে ই-স্বাক্ষর বাকি রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে চূড়ান্ত সংখ্যায় কিছু পরিবর্তন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ গবেষণা সংস্থা ‘সবর ইনস্টিটিউট’এর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের সিংহভাগই মুসলমান। বিশেষ করে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর আসন নন্দীগ্রামে যে ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের ৯৫.৫ শতাংশই মুসলিম।
বিজ্ঞাপন
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের তথ্য বলছে নন্দীগ্রামে আড়াই লক্ষের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ মুসলিম। প্রথমে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের ১০ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম বিবেচনাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত তালিকা মিলিয়ে নন্দীগ্রামের ভোটার তালিকা থেকে মোট ২,৮২৬ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭০০ জন মুসলিম এবং ১২৬জন অমুসলিম। অর্থাৎ বাদ যাওয়া নামের ৯৫.৫ শতাংশ মুসলমান, জানিয়েছে ‘সবর ইনস্টিটিউট’।
গবেষণা সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘এর ফলে এসআইআর প্রক্রিয়া এবং তার প্রভাব সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮.৯ শতাংশ নারী এবং ৫১.১ শতাংশ পুরুষ, যা থেকে বোঝা যায় যে এই সমস্যা লিঙ্গ নির্বিশেষে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করে।’
এছাড়াও মুসলমান অধ্যুষিত অন্যান্য জেলাতেও বহু সংখ্যক মুসলমান ভোটারের নাম বাদ গেছে তালিকা থেকে। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে আছেন বাংলার নবাব মীর জাফরের পরিবারের উত্তরসূরীদের অন্তত দেড়শো জন। আবার মালদা জেলার মুসলমান অধ্যুষিত সুজাপুর আর মোথাবাড়িতে গত সপ্তাহে যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, সেই দুটি অঞ্চলের প্রায় দুই লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে তালিকা থেকে।

এদিকে এসআইআর-এ ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও মোদি সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল সভানেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার অভিযোগ, টার্গেট করে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য, দেখে দেখে মতুয়া, রাজবংশী, সংখ্যালঘু- একটা সম্প্রদায়ের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার চাকদহের এক নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন, ‘দেখে দেখে একটা কমিউনিটিকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। দেখে দেখে মতুয়া, রাজবংশী, সংখ্যালঘুদের বাদ দিচ্ছেন। উকুন বাছার মতন করে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বাগদা, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় উকুন বাছার মতো করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আশ্বস্ত করেছেন, ৩২ লাখ নাম উঠেছে, বাকিদেরও তোলার চেষ্টা করবেন। বাংলায় বিজেপিকে শূন্য করার ডাক দিয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, সংশোধনের আগে রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লাখের বেশি। একাধিক ধাপের ছাঁটাই ও পুনর্বিবেচনার পর এই সংখ্যায় বড়সড় ওঠানামা হয়েছে। নির্বাচনের মুখে এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, কলকাতা২৪
এমএইচআর

