ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো ভেবে এর কড়া মাসুল দিচ্ছেন এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! এক কথায় ট্রাম্পের ‘এলাম-দেখলাম-জয় করলাম’ এর দিন শেষ!
ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ে একের পর এক যুদ্ধাস্ত্র হারিয়ে ‘বেকায়দায়’ পড়েছে আমেরিকা। ইতিমধ্যেই কয়েক লাখ কোটি ডলার উবে গেছে ওয়াশিংটনের। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি তেহরানের সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে হার মানছে যুক্তরাষ্ট্র?
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বাঘা বাঘা সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এখন বিরাট প্রশ্ন, দুই ‘সুপার পাওয়ার’কে নাকের জল চোখের জল এক করে ছেড়েছে পারস্যের দেশ ইরান।
দ্য ইউরেশিয়ান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে পা দেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধ্বংস হয়েছে দু’ডজনের বেশি লড়াকু জেট।
এ ছাড়া আমেরিকার চারটি ‘টার্মিনাল হাই-অল্টিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা এবং কাতারে মোতায়েন কয়েক কোটি ডলারের এএন/এফপিএস-১৩২ ব্লক ৫ আপগ্রেডেড আর্লি ওয়ার্নিং রেডার উড়িয়েছে ইরান।
তা ছাড়া যুদ্ধের মধ্যেই ‘অকেজো’ হয়ে পড়েছে অত্যাধুনিক মার্কিন বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড। ফলে লোহিত সাগর থেকে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধজাহাজটিকে গ্রিসের বন্দরে সরানোর নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
বিজ্ঞাপন
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে ওই রণতরীতে আগুন ধরে যায়। যদিও এই বিষয়ে ‘তদন্ত চলছে’ গোছের দায়সারা বিবৃতি দিয়েছে আমেরিকা।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিদের যৌথ আক্রমণ ভোঁতা করে দিয়ে যে কায়দায় ইরানি সেনাবাহিনী প্রত্যাঘাত শানাচ্ছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
তেহরানের রণকৌশল ‘ডি-কোড’ করতে নেমে একটি দিকেই নজর গেছে তাদের। সেটা হল, তুলনামূলক ভাবে সস্তা এবং উদ্ভাবনী হাতিয়ারের সাহায্যে আমেরিকার কোটি কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করতে সক্ষম হচ্ছে ইরান, যা ‘খেলা ঘোরাচ্ছে’ পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে।
কতগুলি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ইরান যুদ্ধে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের বহুল ব্যবহার করছে মার্কিন বাহিনী। এই পাইলটবিহীন যানগুলির এক একটির দাম ৫ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।
এখন পর্যন্ত মোট ১২টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ, লড়াইয়ের প্রথম চার সপ্তাহে শুধুমাত্র এই যুদ্ধাস্ত্রটির ধ্বংস বাবদ আমেরিকার লোকসানের অঙ্ক ৫০ কোটি ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে।
গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে ধ্বংস হয় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান। এর ঠিক ১০ দিনের মাথায় ১২ মার্চ ইরাকে কেসি-১৩৫ গ্রুপের জ্বালানি সরবরাহকারী একটি ট্যাঙ্কার বিমানকে উড়িয়ে দেয় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। তাতে নিহত হন ছয় ক্রু সদস্য।
পরে আমেরিকার আরও একটি কেসি-১৩৫ বিমান গুলি করে নামায় তেহরান। সংশ্লিষ্ট উড়ন্ত ট্যাঙ্কারগুলির নির্মাণখরচ সাত-আট কোটি ডলার বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থা বোয়িংয়ের তৈরি এফ-১৫ ইগল জেটগুলির দাম ৯-৯.৭ কোটির মধ্যে ঘোরাফেরা করে। এতে যুদ্ধাস্ত্র সংযুক্ত করলে অতিরিক্ত দিতে হবে ১০-১৫ কোটি ডলার।
গত ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করে আইআরজিসি। যদিও তা অস্বীকার করেছে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫কে বিশ্বের অন্যতম সেরা পঞ্চম প্রজন্মের লড়াকু জেট বলা যেতে পারে। যুদ্ধবিমানটির উল্লম্ব ভাবে ওঠানামা করার ক্ষমতা রয়েছে।
এর এক একটির দাম ৮০-১২৫ কোটি ডলার। তার সঙ্গে আবার যুক্ত হবে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ-হেন এফ-৩৫কে এখনও পর্যন্ত কোনও লড়াইয়ে খোয়াতে হয়নি আমেরিকাকে। সংশ্লিষ্ট লড়াকু জেটটি কোনও রেডারে ধরা পড়ে না বললেই চলে।
‘সেন্টকম’-এর দাবি, যুদ্ধের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি এফ-৩৫কে জরুরি অবতরণ করাতে হয়েছে। জেটটির পাইলট অক্ষত আছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডের এই মন্তব্য ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, ইরানের ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এফ-৩৫র একটি ডানা। এর জেরে কোনও মতে জেট নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান পাইলট।
আমেরিকার ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণ কর্মসূচিগুলির একটি হল এফ-৩৫ লাইটনিং টু। এই যুদ্ধবিমানটির পিছনে এখন পর্যন্ত দু’লাখ কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে পেন্টাগন। এর একাধিক শ্রেণিবিভাগ রয়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর পাশাপাশি বিমানবাহী রণতরীতেও মোতায়েন থাকে এই জেট। প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিন এখন পর্যন্ত এফ-৩৫-এর প্রায় ১,৩০০ ইউনিট তৈরি করেছে বলে জানা গিয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের জেট ধ্বংসের চেষ্টা সত্যি হলে বিরল কৃতিত্ব অর্জন করবে ইরান। তবে লড়াইয়ের মধ্যে পেন্টাগনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে পড়া।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে লোহিত সাগরে মোতায়েন ছিল ওই যুদ্ধজাহাজ। গত ১২ মার্চ হঠাৎই তাতে আগুন লেগে যায়। ফলে তড়িঘড়ি ফোর্ডকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সৌদা উপসাগরের নৌসেনা ঘাঁটিতে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে আমেরিকা।
‘সেন্টাকম’-এর দাবি, বিমানবাহী রণতরীর লন্ড্রি রুম থেকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। যদিও সে কথা মানতে নারাজ অনেক সামরিক বিশ্লেষকই। তাদের অনুমান, অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা।
পাশাপাশি, প্রকাশ্যে এসেছে অন্তর্ঘাতের তত্ত্বও। ফলে এ ব্যাপারে তদন্তে নেমেছে পেন্টাগন। পরমাণু শক্তিচালিত জেরাল্ড আর ফোর্ড নির্মাণে ১,৩৩০ কোটি ডলার খরচ করেছে আমেরিকা।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেট বহুল পরিমাণে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিটির আনুমানিক দাম ১০-৩০ লাখ ডলার।
অন্য দিকে, মাত্র ৮-১০ লাখ ডলার খরচ করে এক একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ইরান। অস্ত্র নির্মাণে ব্যয়বরাদ্দের এই বৈষম্যই পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকার ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠছে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
তেহরানের দাবি, সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কাতারে মোতায়েন উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী রেডার ব্যবস্থাকে উড়িয়েছে আইআরজিসি।
সংশ্লিষ্ট রেডারটির পোশাকি নাম ‘এএন/এফপিএস-১৩২’। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেটা পশ্চিম এশিয়ায় চোখ ও কানের কাজ করছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। রেডারটির পাল্লা ৫,০০০ কিলোমিটার এবং আনুমানিক মূল্য ১১০ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, যে গতিতে লড়াইয়ের তীব্রতা বাড়ছে তাতে অচিরেই ইহুদি ও আমেরিকার অস্ত্রের ভাণ্ডারে পড়বে টান। ইরানের এই সমস্যা কম।
কারণ, ঘরের মাটিতেই ‘দামে কম মানে ভাল’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করছে তারা। শুধু তা-ই নয়, তেহরানের কাছে আছে ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র-শহর’ (মিসাইল সিটি)। ফলে প্রয়োজনে আরব দুনিয়ায় আরও বড় কাণ্ড ঘটনার সক্ষমতা রয়েছে আইআরজিসির।
আমেরিকা ও ইসরায়েলে প্রত্যাঘাত শানাতে শাহেদ ড্রোনে ভরসা রেখেছে ইরান, যার খরচ মেরেকেটে ৩০-৫০ হাজার ডলার। এর সাহায্যে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মার্কিন ঘাঁটি এবং দূতাবাসে নির্ভুল আক্রমণ শানিয়েছে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’।
এর মধ্যে অন্যতম হল বাহরাইনের নৌসেনা ছাউনি। সেখানে শাহেদ আছড়ে পড়ার পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের খরচখরচা নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আমেরিকার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)।
তাদের দাবি, লড়াইয়ের প্রথম ছ’দিনে শুধুমাত্র গোলা-বারুদের নিরিখে ১,২০০ কোটি ডলার ব্যয় করে ফেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যদিও এই অঙ্ককে ১,১৩০ কোটি ডলার বলে দেখিয়েছে পেন্টাগন। অর্থাৎ, দিনে ২০০ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র তেহরানের উপর প্রয়োগ করছে আমেরিকা।
আর তাই পশ্চিম এশিয়ায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পকে ইতিমধ্যেই মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের কাছে ২০ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দের আবেদন পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছে পেন্টাগন।
আরও পড়ুন:
সেই টাকায় হাতিয়ারের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে বলে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের এক পদস্থ কর্তা। ইরান যুদ্ধের অন্য বিপজ্জনক দিকটিও নজর এড়াচ্ছে না তাদের।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমছে আমেরিকার, যেটা চীন এবং রাশিয়ার মতো মহাশক্তিধর দেশগুলির মোকাবিলার পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ।
জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির ঘাঁটিগুলিতে এফ-৩৫ জেট মোতায়েন রেখেছে ওয়াশিংটন। এর ধ্বংসশক্তি ইরান পেয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তবে এর উল্টো যুক্তিও রয়েছে। ইসরায়েলি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আলমা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য উদ্ধৃত করে ‘দ্য টাইমস’ লিখেছে, সংঘাত শুরুর আগে ইরানের অস্ত্রভান্ডারে ২৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। কিন্তু সেই সংখ্যাটা বর্তমানে এক হাজারে নেমে এসেছে। সে কারণে অচিরেই রণকৌশল বদলাতে পারে তেহরান।
-এমএমএস

