মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবমেরিন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবমেরিন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন

প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আর্কটিক মহাসাগরের তলদেশ জুড়ে একটি বিশাল মানচিত্র তৈরি এবং পর্যবেক্ষণ অভিযান পরিচালনা করছে চীন, যার মাধ্যমে সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করছে দেশটি। নৌ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সাবমেরিন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য এই সামুদ্রিক অবস্থার বিস্তারিত জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রাখবে।

একটি উদাহরণ হিসেবে- বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা শিপ-ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা যায়, চীনের ওশান ইউনিভার্সিটির পরিচালিত গবেষণা জাহাজ ‘ডং ফাং হং ৩’, ২০২৪ এবং ২০২৫ সাল জুড়ে তাইওয়ান এবং মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামের নিকটবর্তী সমুদ্রে এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকাগুলোতে বারবার যাতায়াত করেছে। 


বিজ্ঞাপন


ওশান ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘ডং ফাং হং ৩’ জাপানের কাছে সমুদ্রের তলদেশের বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম শক্তিশালী চীনা সেন্সরগুলো পরীক্ষা করেছিল এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আবারও একই এলাকায় ফিরে গিয়েছিল। এছাড়াও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, এটি শ্রীলঙ্কা এবং ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী জলসীমায় বারবার যাতায়াত করে মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। 

বিশ্ববিদ্যালয়টি বলছে, জাহাজটি কাদা জরিপ এবং জলবায়ু গবেষণা করছিল। তবে এর শিক্ষাবিদদের লিখিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, এটি সমুদ্রের তলদেশে ব্যাপক ম্যাপিংও পরিচালনা করেছে। 

নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ডং ফাং হং ৩-এর মাধ্যমে যে ধরনের গভীর সমুদ্রের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে তা চীনকে সমুদ্রের তলদেশের এমন একটি চিত্র দিচ্ছে যা তাদের সাবমেরিনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে মোতায়েন করতে এবং শত্রুপক্ষের সাবমেরিনগুলোকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের অধ্যাপক এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সাবমেরিন কর্মকর্তা জেনিফার পার্কার বলেন, ‘চীন যা করছে তার পরিধি শুধু সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বিশালতার দিকে তাকালে এটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তারা সাবমেরিন পরিচালনার ওপর ভিত্তি করে একটি অভিযানমূলক ও গভীর সমুদ্রের নৌ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়’।


বিজ্ঞাপন


এদিকে ডং ফাং হং ৩ একা কাজ করছে না। এটি কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সর সম্বলিত একটি বৃহত্তর সমুদ্র ম্যাপিং এবং মনিটরিং অভিযানের অংশ। 

এই প্রচেষ্টাকে ট্র্যাক করার জন্য রয়টার্স চীনা সরকার ও ওশান বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য রেকর্ড, জার্নাল নিবন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র খতিয়ে দেখেছে। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের কোম্পানি স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের তৈরি একটি শিপ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রশান্ত, ভারত বা আর্কটিক মহাসাগরে সক্রিয় ৪২টি গবেষণা জাহাজের পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের গতিবিধি বিশ্লেষণ করেছে। 

রয়টার্সের অনুসন্ধান পর্যালোচনা করা নয়জন নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞের মতে, যদিও এই গবেষণার বেসামরিক উদ্দেশ্য রয়েছে—যেমন এর কিছু জরিপ মৎস্যক্ষেত্র বা এমন এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে যেখানে চীনের খনিজ অনুসন্ধানের চুক্তি রয়েছে—তবে এটি একটি সামরিক উদ্দেশ্যও পূরণ করে।

তবে পানির নিচের ভূখণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষণা জাহাজগুলো সমুদ্রের তলদেশে আঁটসাঁট লাইনে সামনে-পেছনে চলাচলের মাধ্যমে ম্যাপিং করে। ট্র্যাকিং ডেটা দেখায়, রয়টার্স ট্র্যাক করা জাহাজগুলো প্রশান্ত, ভারত এবং আর্কটিক মহাসাগরের বিশাল অংশে এই ধরণের চলাচল করেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকাশিত জাহাজের বিবরণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর প্রেস রিলিজ পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেখা যায়, রয়টার্স কর্তৃক ট্র্যাক করা জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত আটটি সমুদ্রের তলদেশে ম্যাপিং করেছে এবং আরও ১০টি জাহাজ ম্যাপিংয়ের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম বহন করেছে। 

অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন বাহিনীর সাবেক প্রধান পিটার স্কট বলেছেন, এই জাহাজগুলোর জরিপের তথ্য চীনা সাবমেরিনগুলোর জন্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সম্ভাব্য অমূল্য সম্পদ হতে পারে। কারণ যেকোনো সামরিক সাবমেরিন নাবিক তিনি যে পরিবেশে কাজ করছেন তা বোঝার জন্য প্রচুর পরিশ্রমস করতে হয়। 

শিপ-ট্র্যাকিংয়ের তথ্যমতে, চীনের সমুদ্র তলদেশ জরিপ প্রচেষ্টা আংশিকভাবে ফিলিপাইনের আশেপাশের সামরিক গুরুত্বপূর্ণ জলসীমা, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের কাছে এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক অ্যাটলের মার্কিন সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায়ও রয়েছে।

জেনিফার পার্কার বলেন, ‘যদি আপনি এই কাজের বিশাল বিস্তৃতির দিকে তাকান, তবে এটি স্পষ্ট যে তারা একটি এক্সপেডিশনারি ব্লু-ওয়াটার নেভাল সক্ষমতা অর্জন করতে চায় যা সাবমেরিন অপারেশনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা।’

তবে চীনের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় সমুদ্রের তলদেশ ম্যাপিং এবং মনিটরিং কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফিতর পেন্টাগনও রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। 

সূত্র: রয়টার্স

এমএইচআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর