ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত একটি মার্কিন-ব্রিটিশ ঘাঁটির দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা জন্ম দিয়েছে ইরান। যদিও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি ব্যর্থ হয়েছে, মাঝ পথেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানের এই প্রচেষ্টা চলমান যুদ্ধের চিত্র পাল্টে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে আসল সক্ষমতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং তেহরান প্রকাশ্যে দাবি করে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইরান যদি সত্যিই প্রকাশ্যে ঘোষিত এই সীমার দ্বিগুণ পাল্লার কোনো হামলা চালানোর চেষ্টা করে থাকে, তার মানে হলো ইরানের এমন অঘোষিত সক্ষমতা রয়েছে, যা সম্পর্কে বিশ্ব জানে না।
বিজ্ঞাপন
গত শুক্রবার, হরমুজ প্রণালিকে লক্ষ্য করে অবস্থান নেওয়া ইরানি ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি এবং গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাজ্য। এর পরেই দিয়েগো গার্সিয়ায় দুইটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক কখন ছোড়া হয়েছিল তা জানা যায়নি।

কিছু বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হয়তো মধ্যম-পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইআরবিএম) পরীক্ষা করছিল, যা সম্ভবত ভারত মহাসাগরের আরও গভীরে এবং এমনকি দক্ষিণ ইউরোপেও পৌঁছাতে পারে। এটি তেহরানকে তার শত্রুদের কাছে প্রকৃত হামলার পরিসীমা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রেখে সুবিধা আদায়েও সাহায্য করবে।
এই অস্পষ্টতা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধির যেকোনো ধারণা উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা স্তরগুলো পুনর্মূল্যায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।
বিজ্ঞাপন
ডিয়েগো গার্সিয়াও কোনো ছোটখাটো সম্পদ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান কেন্দ্র, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহ ও আক্রমণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভারী বোমারু বিমান এবং নজরদারি বিমানগুলোর ঘাঁটি।
ইরানের আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি বলেছে, ঘাঁটিটিকে লক্ষ্যবস্তু করা একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ... যা দেখিয়ে দেয় যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা শত্রুপক্ষের পূর্বের ধারণারও বাইরে’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিয়েগো গার্সিয়াতে আঘাত হানার চেষ্টার মাধ্যমে ইরান সংঘাতের ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছে এবং এই ইঙ্গিত দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিরাপদ আশ্রয়ই খুব দূরে নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে, কারণ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দক্ষিণের দিকে সরিয়ে নিতে হবে।
দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির গুরুত্ব কী?
দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ এবং এখানে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত। দিয়েগো গার্সিয়া সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, এবং এটি নিকটতম ভূখণ্ড থেকে প্রায় এক হাজার মাইল মানে ১,৬০৯ কিমি দূরে অবস্থিত। নাইন-ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে হামলা চালারোর জন্য এই যৌথ সামরিক ঘাঁটি মার্কিন বি-টু বম্বারে জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহার হত।

তবে এই দুর্গম দ্বীপটি নিয়ে যুক্তরাজ্য এবং মরিশাসের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে একটি আঞ্চলিক বিরোধ চলছে। গত মে মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া এক চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য বছরে গড়ে ১০১ মিলিয়ন পাউন্ড ফি দিয়ে ৯৯ বছরের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া পুনরায় ইজারা নেবে।
সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি
এমএইচআর

