শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

trump-netaniahu
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের স্বভাবসুলভ কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র- ইরানের সাউথ পার্স- এ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। যার প্রতিশোধ হিসেবে কাতারের একটি জ্বালানি কমপ্লেক্সে হামলা করে ইরান। পাল্টাপাল্টি এই হামলার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যে। একই সাথে এই ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষোভও তীব্র করেছে।

জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার এই ঘটনা নিয়ে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে আবারও ইরানকে হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ইসরায়েল যে এই হামলার পরিকল্পনা করছে, এ সম্পর্কেও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন তিনি।


বিজ্ঞাপন


মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের পোস্টে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ নিয়ে কতটা একমত ও একই অবস্থানে রয়েছে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। এছাড়া ট্রাম্পের এই পোস্ট যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং এর কৌশল ও লক্ষ্য নিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে- তা নিয়েও নানা চলছে আলোচনা।

হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র 'কিছুই জানত না'

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানত না।’ যদিও তার এই বক্তব্যটি হামলার পর ইসরায়েলের একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

মধ্যপন্থী সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ রিপোর্ট করেছে যে, এই হামলাটি ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আগে থেকেই সমন্বয় করা হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল।’


বিজ্ঞাপন


আরও এক ধাপ এগিয়ে ডানপন্থী পত্রিকা ইসরায়েল হায়োম দাবি করেছে যে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষে পারস্য উপসাগরীয় তিনটি দেশের নেতাদের সাথে আসালুয়েহ-তে আসন্ন ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যান্য অনেক দাবির মতো এখানেও বক্তব্যের সত্যতা আসলে কতটা সেটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

আরও পড়ুন

ইরানের গ্যাস ফিল্ডে আর হামলা চালাবে না ইসরায়েল: নেতানিয়াহু

ইসরায়েলি হামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছেন, তাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘ক্রোধের বশবর্তী হয়ে’ গ্যাসক্ষেত্রের ওপর ‘হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইসরায়েল।’

এই ধরনের ভাষা সাধারণত ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার বর্ণনা দিতেই ব্যবহার করেন তিনি- যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রের সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে নয়।

Trump
সোস্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের বিবৃতি। ছবি: সংগৃহীত

তাহলে ট্রাম্প কি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইসরায়েল অবিবেচকের মতো কাজ করেছে?

ইসরায়েল আর গ্যাসক্ষেত্রে 'কোনো হামলা করবে না'

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যেসব পোস্ট দেন, সেখানে মাঝেমধ্যেই ক্যাপিটাল লেটার বা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করেন। কিন্তু ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার পর যে দীর্ঘ পোস্টটি তিনি দিয়েছেন সেখানে মাত্র একবারই সবকটি বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান সাউথ পার্স ক্ষেত্রের ওপর ইসরায়েল আর কোনো হামলা করবে না, যদি না ইরান বোকামি করে অত্যন্ত নিরপরাধ একটি দেশ- কাতার এর ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়।’

সবসময় পরিস্থিতির ওপর সরাসরি নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাওয়া প্রেসিডেন্টের জন্য, এটি কি আগে থেকেই দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, নাকি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি এটি একটি সতর্কবার্তা?

বিভিন্ন সময় সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্পের দেওয়া অনেকটা অগোছালো পোস্টগুলোর মতো এক্ষেত্রেও মূল বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন।

আরও পড়ুন

ইরানের হামলায় ইসরায়েলের তেল শোধনাগারে আগুন

তবে এর মাধ্যমে আগের সেই সব প্রতিবেদন আবারও সামনে আসছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে, যুদ্ধ শুরুর দিকে ইরানের তেলের ডিপোগুলোতে ইসরায়েলি হামলার কারণে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

তাহলে কি যুদ্ধের লক্ষ্য আলাদা হয়ে যাচ্ছে?

গভীর রাতে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি পোস্ট থেকে, খুব বেশি কিছু ধারণা করা, হয়তো ভুল হবে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, দুই দেশ একই পথে চলছে। যদিও মাঝেমধ্যেই অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও তাদের মধ্যে দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। যেখানে তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় ইসরায়েল ‘একাই কাজ করেছে।’

আর ইসরায়েলি বাহিনীকে ভবিষ্যতে এই ধরনের হামলা থেকে ‘বিরত থাকতে’ অনুরোধ করেছেন ট্রাম্প।

নেতানিয়াহু নিজেকে এবং ট্রাম্পকে ইরানের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন- যেখানে ট্রাম্পই প্রধান।

Iran
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ইরান। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ‘কেউ কি সত্যিই মনে করে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কেউ বলে দিতে পারে কী করতে হবে?’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় না যে আমাদের মতো (ট্রাম্প ও আমি) অন্য কোনো নেতা এত সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। তিনি নেতা, আর আমি তার মিত্র।’

বৃহস্পতিবার সকালে লন্ডনে ইসরায়েলি দূতাবাসের মুখপাত্র অ্যালেক্স গ্যান্ডলার বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা, আইআরজিসি, তাদের ব্যালিস্টিক ও পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে আমাদের লক্ষ্যগুলো অভিন্ন। আমরা একই জিনিস চাই।’

যদিও দুই মিত্র অনেক বিষয়ে একমত, তবে ইরানে 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' এর ব্যাপারে ইসরায়েল অনেক বেশি অনড়।

যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন সক্ষমতা এবং তাদের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো সামরিক কার্যক্রমে মনোযোগ দিয়েছে, সেখানে ইসরায়েল ইরানের নেতাদের হত্যা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে।

আরও পড়ুন

হরমুজ দিয়ে চলাচলে ভারতকে যে শর্ত দিল ইরান! 

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত ডেভিড স্যাটারফিল্ড বলছেন, কেবল যুদ্ধ থামানোর সময় নির্ধারণ ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে ইসরায়েল ও আমেরিকার উদ্দেশ্যে মিল রয়েছে।

তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ট্রাম্প এমন একটি বিজয় চান, যা অর্থহীন মনে হবে না। তিনি কেবল শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চিন্তায় সীমাবদ্ধ নন।’

অন্যদিকে স্যাটারফিল্ডের মতে, নেতানিয়াহুর কাছে ইরানের পতনই একটি ‘কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য’।

হামলা সম্পর্কে ইরানের কাছে 'তথ্য ছিল না'

নিজের পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই হামলায় কাতার জড়িত ছিল না, এমনকি তাদের কাছে আগাম কোনো তথ্যও ছিল না। তিনি লিখেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত’ ইরানও এটি জানত না এবং তারা ‘অযৌক্তিক ও অন্যায্যভাবে’ প্রতিশোধ নিয়েছে।

ট্রাম্প ইরানকে ছাড় দিচ্ছেন না ঠিকই, তবে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, তেহরান হয়তো ভুলবশত কাতারকে জড়িত মনে করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

ইরানের গ্যাসক্ষেত্র 'উড়িয়ে দেওয়ার' হুমকি

ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টের কিছু অংশ ছিল ট্রাম্পের চিরচেনা স্টাইলে। নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য নজিরবিহীন হুমকি। তিনি সতর্ক করেছেন যে, ইরান যদি কাতারের এলএনজি স্থাপনায় আবারও হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসরায়েলের সাহায্য বা সম্মতি নিয়ে অথবা ছাড়াই সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটি এমনভবে ধ্বংস করবে যা ইরান আগে কখনো দেখেনি।’

Israel2
ইসরায়েলের তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা। ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই ধরনের হুমকিপূর্ণ কথা বলতে পছন্দ করেন। প্রায়ই এই ধরনের কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দাবি করা ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এছাড়া এটাও সত্য যে, ইরান এবং দেশটির জনগণের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ওয়াশিংটন করেছে, তার থেকেও বহু গুণ বেশি ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে।

তবে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ‘সম্মতি’ সংক্রান্ত যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি ছিল বেশ শ্রুতিকটু বা বেমানান।

এটি কি নেতানিয়াহুর প্রতি কোনো তিরস্কার ছিল নাকি ভবিষ্যতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একটি কঠোর সতর্কতা, তা বোঝা কঠিন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেইক আমেরিক গ্রেইট অ্যাগেইন বা মাগা আন্দোলনের কিছু সমর্থক ইতিমধ্যেই বিশ্বাস করে যে, এই যুদ্ধে আমেরিকা নয় বরং ইসরায়েলই কলকাঠি নাড়ছে। তাই এই কথাটিকে প্রেসিডেন্টের সমালোচকরা একটি দুর্ভাগ্যজনক 'ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ' (মনের অজান্তে বেরিয়ে আসা সত্য) হিসেবে দেখছেন।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে তেল ও গ্যাসের দাম আবারও বাড়ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করার চেষ্টায়ও কোনো অগ্রগতি না থাকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ধৈর্য হারাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। এই যুদ্ধ তাকে এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে ফেলছে, যা তার প্রশাসন সম্ভবত আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। ইসরায়েলে এই যুদ্ধের সমর্থন এখনও আকাশচুম্বী থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রে তা বর্তমানে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে যে কারণে ইরানের পাশে নেই মুসলিম বিশ্ব

এই সংঘাত নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরও একটি মেয়াদে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র হলেও, এটিই প্রথমবার যখন তারা এক সাথে কোনো যুদ্ধ লড়ছে। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে তারা বেশ কিছু বড় সাফল্যও অর্জন করেছে। কিন্তু প্রতিটি দিন পার হওয়ার সাথে সাথে এই যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল বলে প্রমাণিত হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর