বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি নিরাপদে সচল রাখতে মিত্র দেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ডাকে খুব একটা সাড়া মেলেনি। একের পর এক দেশ তার এই আহ্বান প্রত্যখ্যান করছে। ফ্রান্স ও জাপানের পর এবার সেই তালিকায় যোগ দিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং গ্রিস।
শনিবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে কাজ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এই জোটে যোগ দেবে।
বিজ্ঞাপন
ফ্রান্স
ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই প্রথমে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ফরাসি মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘না। বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত : রক্ষণাত্মক, সুরক্ষামূলক।’
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করবে না এবং তাদের বিমানবাহী রণতরী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৫তম দিনেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ও শঙ্কা বৃদ্ধি করেছে।
ফ্রান্সের এই বক্তব্য ট্রাম্পের কথিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের দাবির মুখে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য
সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটে এক সংবাদ সম্মেলনে বিট্রিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য আর বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িত হবে না। যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকার হলো এই অঞ্চলে তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সাথে নিজেকে এবং তার মিত্রদের রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
তিনি বলেন, ‘ব্রিটেন নিজেকে বৃহত্তর সংঘাতে জড়িত হতে দেবে না এবং এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে’।
এরআগে যুক্তরাজ্যের কর্ম এবং পেনশন মন্ত্রী প্যাট মেকফেডান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের পরিস্থিতি আমরা দেখছি তার সঙ্গে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোট- ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই।
১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ নিয়ে ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ন্যাটোর মূল নীতিগুলোর মধ্যে একটি সংস্থাটির সংবিধানের পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ন্যাটোভুক্ত কোন একটি দেশের বিরুদ্ধে হামলার অর্থ সবার বিরুদ্ধেই হামলা।
এর আগে সকালে আরেক অনুষ্ঠানে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টার বলেছেন, ‘ন্যাটো এমন কোনো জোট নয়, যা কোনও মিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছিল যাতে তারা নিজের ইচ্ছেমত যুদ্ধে যায় এবং পরে অন্য সকলকে তা অনুসরণ করতে বাধ্য করে।’
স্যার নিক কার্টারের বক্তব্যের সাথে একমত কিনা জানতে চাইলে ব্রিটেনের কর্ম এবং পেনশন মন্ত্রী প্যাট মেকফেডান বলেন, জেনারেল কার্টার ‘সঠিক’ এবং বর্তমান যুদ্ধকে ‘ন্যাটো যুদ্ধ নয়’ বরং ‘মার্কিন-ইসরায়েলি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জার্মানি
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যুদ্ধে জার্মানির সামরিক অংশগ্রহণ থাকবে না৷’
তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী যেখানে পারেনি সেখানে হরমুজ প্রণালীতে গুটিকয়েক ইউরোপীয় যুদ্ধজাহাজের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প কী প্রত্যাশা করেন?’
সোমবার জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্রও বলেছেন, ইরানের যুদ্ধের সাথে ন্যাটোর কোনও সম্পর্ক নেই, ফলে জার্মানি যুদ্ধে অংশ নেবে না বা সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, ততদিন কোনও অংশগ্রহণ থাকবে না, এমনকি সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার কোনও প্রচেষ্টাতেও নয়।
জাপান
সোমবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে সেখানে নিজেদের নৌবাহিনীর কোনো জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা টোকিওর নেই।
বলেন, “আমরা এখনও (হরমুজ প্রণালীতে) নিরাপত্তা জাহাজ পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আইনি ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে জাপান স্বাধীনভাবে কী কী করতে পারে, সে সম্পর্কে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।
জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমিও একই বক্তব্য জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বার্তায় তিনি বলেছেন, আমরা কী করতে পারি এবং বর্তমান পরিস্থিতি আমদের তা করা উচিত কিনা— সেটি অবশ্যই আলাদা বিষয়।
গ্রিস
গ্রীক সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস বলেছেন, গ্রিসও হরমুজ প্রণালীতে কোনও সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রাণরেখা হিসেবে বিবেচিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি, যার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই চলাচল করে।
বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায় এশিয়ায়, বাকি অংশ ইউরোপে। চীনের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ২৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।
প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে; ব্যস্ত সময়ে কখনও কখনও প্রতি ছয় মিনিট পরপর জাহাজ চলতে দেখা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই কার্যত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে দাম হু হু করে বেড়ে গেছে।
সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি
এমএইচআর

