ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী ‘কার্যত বন্ধ’ হয়ে যাওয়ায় তেলের সংকট মোকাবিলায় ‘স্ট্র্যাটেটিক রিজার্ভ’ বা কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ)।
বুধবার এক বিবৃতিতে আইইএ-এর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল জানান, সংস্থার ৩২টি সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে তাদের জরুরি তেলের মজুত থেকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘তেলবাজারে আমরা যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, তার সত্যিই অভূতপূর্ব। তাই আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আইইএ–এর সদস্য দেশগুলো অভূতপূর্ব পরিসরের একটি জরুরি সমষ্টিগত পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইইএ জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী যথোপযুক্ত সময়সীমার মধ্যে এই জরুরি মজুত বাজারে ছাড়া হবে।
সংস্থাটি বলছে, সদস্যদেশগুলোর কাছে ১০২ কোটি ব্যারেলের বেশি জরুরি মজুত রয়েছে এবং শিল্প খাতের কাছে সরকারের বাধ্যবাধকতার আওতায় আরও ৬০ কোটি ব্যারেল মজুত আছে। ১৯৯১, ২০০৫, ২০১১ এবং ২০২২ সালে দু’বার—এ পর্যন্ত মোট ছয়বার আইইএ সমন্বিতভাবে তেলের মজুত ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছে।
এরআগে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) আইইএ নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাতটি উন্নত অর্থনীতির দেশের জোট জি-৭ মন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার নীতিগত সমর্থন রয়েছে তাদের। প্রয়োজনে কৌশলগত তেল রিজার্ভও ব্যবহার করা হতে পারে।’
বিজ্ঞাপন
স্ট্র্যাটেজিক তেলের মজুত কোথায় থাকে এবং এটা ছাড়লে কী পরিবর্তন হতে পারে?
বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আইইএ সদস্য সব দেশেরই ৯০ দিনের জন্য তেল মজুত করে রাখা বাধ্যতামূলক।
তবে এই তেল নির্দিষ্ট কোনো জিওগ্রাফিক লোকেশন বা ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে রাখা হয় না। যেমন যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে শেল বা বিপির মতো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন টার্মিনাল ও শোধনাগারে এই তেল মজুদ করে রাখে এবং অন্য কোথাও মজুত করে রাখা তেলকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
মজুত থেকে তেল ছাড়ার অর্থ এটা নয় যে, বাজারে হঠাৎ করে তেলের বন্যা বয়ে যাবে বা পরিমাণ বেড়ে যাবে। বরং এর মাধ্যমে উৎপাদনকারীরা শোধনাগারগুলোর জন্য বাজারে আরো বেশি তেল সহজলভ্য করে দেয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেহেতু তেল শোধনের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে তাই এই মজুদ তেল ছেড়ে দেওয়া মানেই পেট্রোল বা জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো ‘ম্যাজিক সুইচ’ নয়।
তাছাড়া, প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেলের মজুদের মধ্য থেকে কয়েকশ কোটি ব্যারেল ছেড়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ বারবার নেওয়া সম্ভব না। তাই এই তেল ছাড়ার বিষয়ে ‘প্রস্তুত থাকা’ বা ‘নীতিগতভাবে সম্মত হওয়া’, আসলে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই বাজারকে আশ্বস্ত করার একটি কৌশল মাত্র।
তেলের এই মজুত ছাড়ার বিষয়টি আসলে একটি সংকেত, যার মাধ্যমে সরকারগুলো বোঝাতে চায়, তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন এবং সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এর ফলে তেলের দাম হয়তো কমবে না, তবে দাম আরও অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায়, সরবরাহের যে ঘাটতি তা তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
গত সোমবার তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে গিয়ে উঠেছিল। যদিও পরে দাম কিছুটা কমেছে, তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো অনেক বেশি দামে তেল কেনাবেচা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, দেশে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর পরই জি-৭ জোটের সদস্য দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং জাপান এই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর

