শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধেই কেন পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ইরান যুদ্ধেই কেন পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ভীষণ অস্থিরতা বিরাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। নৌ ও আকাশপথে চলমান এই যুদ্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন নতুন সব কৌশল ও সমরাস্ত্র শক্তি প্রদর্শন করেই চলেছে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে প্রথমবারের মতো প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

শনিবার (৭ মার্চ) এই যুদ্ধ অষ্টম দিনে পদার্পণ করেছে। সংবাদামধ্যম আলজাজিরা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সেন্টকম তাদের এক পোস্টে উল্লেখ করেছে, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা’ প্রদান করে।

সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে উদ্ধৃত করে ওই পোস্টে বলা হয়েছে, আমাদের ইউনিফর্মধারী পুরুষ ও নারীদের জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত। তারা আমাদের শত্রুদের জন্য সংকট তৈরি করতে উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন।

যদিও এই পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বা ইরানের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাহলে পিআরএসএম কী এবং প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের এটি ব্যবহারের গুরুত্ব কোথায়?


পিআরএসএম আসলে কী?


বিজ্ঞাপন


প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএম হলো দূরপাল্লার নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র। এর নির্মাতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘লকহিড মার্টিন’। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তারা মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান হস্তান্তর করে।

লকহিড মার্টিনের তথ্যমতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৬০ কিমি (৩৭ মাইল) থেকে শুরু করে ৪৯৯ কিমিরও (৩১০ মাইল) বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এম-২৭০ এমএলআরএস এবং হিমার্স লাঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। এই দুটি লাঞ্চারই লকহিড মার্টিনের তৈরি এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী এগুলো ব্যবহার করছে।

এম-১৪২ হিমার্স হলো একটি উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন এবং ওজনে হালকা রকেট লাঞ্চার, যা চাকার ওপর বসানো থাকে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এটি খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারে। এক ইউনিটে ছয়টি জিপিএসচালিত রকেট অথবা বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন: এটিএসিএমএস বা পিআরএসএম) বহন করা যায়। খুব অল্পসংখ্যক ক্রু দিয়ে মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এটি পুনরায় লোড করা সম্ভব, এটি এই প্রযুক্তির অন্যতম বিশেষত্ব।

লকহিড মার্টিন জানায়, পিআরএসএম-এ ‘ওপেন সিস্টেম আর্কিটেকচার’ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সহজে আপগ্রেড করা বা অন্য কোম্পানির সরঞ্জামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। এ ছাড়া এতে রয়েছে ‘আইএম এনার্জেটিক পেলোড’ বা সংবেদনহীন বিস্ফোরক প্রযুক্তি। এর অর্থ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডটি আগুন, কামানের গোলার আঘাত বা দুর্ঘটনার ফলে হুট করে বিস্ফোরিত হবে না, তবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সময় এটি ঠিকই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাবে। এই প্রযুক্তিই মূলত এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশেষায়িত করেছে।


পিআরএসএম কেন আলাদা ও যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত কী সুবিধা দিচ্ছে?

পিআরএসএম মূলত বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হবে। এটি হিমার্স লাঞ্চারের বহনকারী যান পরিবর্তন না করেই এর পাল্লা ৩০০ কিমি থেকে বাড়িয়ে ৪৯৯ কিমিরও বেশিতে নিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া পিআরএসএম’র ক্ষেপণাস্ত্র ধারণক্ষমতা এটিএসিএমএস’র দ্বিগুণ। একটি হিমার্স লাঞ্চারে যেখানে মাত্র একটি এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়, সেখানে এটি দুটি পিআরএসএম বহন করতে সক্ষম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে পিআরএসএম ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সেন্টকম। তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি উন্মুক্ত মরুভূমি থেকে এম-১৪২ হিমার্স সিস্টেমের মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দূরপাল্লার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে পিআরএসএম। কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান (বিশেষ করে মুসান্দাম উপদ্বীপ)— যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদ রয়েছে—এই দেশগুলোর অন্তত কিছু অংশ ইরান থেকে ৪০০ কিমি-রও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পিআরএসএম’র পাশাপাশি অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র যেমন— লুকা ওয়ান-ওয়ে ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এটিএসিএমএস এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করছে। লুকা ড্রোনের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিমি, এটিএসিএমএস-এর ৩০০ কিমি এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিমি।

ইরান যুদ্ধেই কেন পিআরএসএম ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র?

ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা বা রেঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত ‘ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ (আইএনএফ) চুক্তির অধীনে এটি সম্ভবত নিষিদ্ধ থাকত। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়। কারণ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্দিষ্ট কিছু ভূমি-উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য নির্ধারিত ৫০০ কিমি (৩১০ মাইল) সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম।

চুক্তিটি ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতা রোনাল্ড রিগ্যান এবং সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ স্বাক্ষর করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপ থেকে ৫০০ কিমি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিমি পাল্লার ভূমিভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি পাল্লার অস্ত্রভান্ডার নির্মূল করা।

চুক্তিটি স্থগিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন তাদের নিজস্ব মাঝারি পাল্লার ভূমিভিত্তিক অস্ত্রাগার পুনরায় তৈরির সুযোগ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পর রাশিয়া পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছিল যেন উভয় পক্ষই ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ওয়াশিংটন প্রথমে এটি প্রত্যাখ্যান করলেও ২০২২ সালে এ নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।

তবে গত বছরের আগস্টে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই স্থগিতাদেশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। মস্কো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি উন্নয়নে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ করেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ‘প্রকাশ্যে ঘোষণা’ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধরনের পদক্ষেপ মস্কোর নিরাপত্তার জন্য একটি ‘সরাসরি হুমকি’ বলে উল্লেখ করা হয় রুশ বিবৃতিতে।

এফএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর