ইরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এরপর থেকেই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহনের এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিশ্বব্যাপী গ্যাস ও তেলের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারতকে ৩০ দিনের ‘অস্থায়ী ছাড়’ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে এই ছাড় সমুদ্রে আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজ বা ট্যাংকারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর শাস্তিমূলক অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যার ফলে ভারতের উপর মোট মার্কিন শুল্ক দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে।
সেই সময়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এবং সেটাই ভবিষ্যতেও অগ্রাধিকার পাবে। এরপর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, ভারত রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ, ইরানের তরফে পাল্টা জবাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে নিশানা করাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে "হরমুজ প্রণালী পার করার চেষ্টা করলে তাকে হত্যা করা হবে।"
বিজ্ঞাপন
ইরান এবং ওমানের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালী বন্ধের প্রভাব জ্বালানির উপর পড়বে। ভারতের তেল সরবরাহের ৪০% হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলেছে?
মার্কিন অর্থ মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ লিখেছেন, ‘বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভারতীয় শোধনাগারগুলোকে রাশিয়ান তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের একটা অস্থায়ী ছাড় দিচ্ছে।’
এর আগে ভারতের বিরুদ্ধে রাশিয়া থেকে তেল কিনে রাশিয়াকে সাহায্য করে প্রকারান্তরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জিইয়ে রাখার অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সেই প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন অর্থ মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে খুব অল্প সময়ের জন্যই এটা মঞ্জুর করা হয়েছে। তাই এটা রাশিয়ার সরকারকে কোনো উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করবে না, কারণ শুধুমাত্র সমুদ্রে আটকে থাকা জাহাজের জন্য তেল নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘ভারত যুক্তরাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং আমরা সম্পূর্ণরূপে আশা করি ভারত আমেরিকা থেকে তেল কেনার পরিমাণ বাড়াবে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখার ইরানের যে প্রচেষ্টা, তার চাপ কমাতে এই অস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
ভারতের জ্বালানি পরিস্থিতি কী?
ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। চলমান হামলা এবং হরমুজ প্রণালীর চারপাশে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেল বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
ভারত তার প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ তেলই অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে। এর প্রায় অর্ধেক পরিমান অপরিশোধিত তেল, যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ২.৫ থেকে ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল, তা হরমুজ প্রণালী দিয়ে আনা হয়ে থাকে। এর বেশিরভাগই ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে আসে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের তেল আমদানি ঘিরেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরাকের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, তারা দৈনিক তেল উৎপাদন এই মুহূর্তে কমিয়ে দিয়েছেন।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম সরবরাহকারী কাতার জানিয়েছে যে, তারা ইরানের ড্রোন হামলার পর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কথা ভেবে উৎপাদন বন্ধ রাখবে।
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স সংস্থা কেপলারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন, "ভারতের শোধনাগার এবং বাণিজ্যিক স্টোরেজে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে।"
সরকারি এক সূত্র বার্তাসংস্থা এএনআইকে মঙ্গলবার জানিয়েছে- ভারতের কাছে এই মুহূর্তে ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ দিনের পেট্রোল ও ডিজেল মজুদ আছে। এর মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত ভাণ্ডারও আছে। এই কৌশলগত ভাণ্ডার স্বল্পমেয়াদী সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য যে ভাণ্ডার রয়েছে, তার থেকে আলাদা।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফিং-এর সময় জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য যেমন পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমানের জ্বালানি রয়েছে।
তিনি জানিয়েছিলেন, এখন হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে পাঠানো হয় না, এমন পথে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যবস্থা করছে ভারতীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, "ভারত বিশ্বব্যাপী তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক, চতুর্থ বৃহত্তম পরিশোধক এবং পঞ্চম বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিকারক। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উদ্ভূত স্বল্পমেয়াদী বাধা মোকাবিলা করার জন্য দেশে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমানের জ্বালানি সহ গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।"
তবে যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রাশিয়া থেকে তেলার কেনার জন্য সাময়িক ছাড়ের কথা জানিয়েছে। এ নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসছে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো কেন্দ্র সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর

