মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

উত্তর প্রদেশে ৩ মুসলিম বৃদ্ধকে মারধর হিন্দু যুবকের, ভিডিও ভাইরাল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

শেয়ার করুন:

উত্তর প্রদেশে ৩ মুসলিম বৃদ্ধকে মারধর হিন্দু যুবকের, ভিডিও ভাইরাল

‘আমাকে আর আমার সঙ্গীদের মারা হয়েছে, ধর্ম তুলে কটু কথা বলা হয়েছে। আমরা শান্তভাবে বসে ছিলাম, কিন্তু ওরা আমাদের ভিডিও তুলে নিজেরাই ভাইরাল করে দিয়েছে। আমরা কোনো ঝগড়া বিবাদ চাই না, কিন্তু আমাদের ন্যায় বিচার চাই। অভিযুক্তের তো জামিন হয়ে গেছে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে-সব ধারা দেওয়ার দরকার ছিল, তা তো দেওয়া হয় নি।’

কথাগুলো বলছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের বদায়ূঁর জেলার সহসওয়ান থানা এলাকার বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সি আব্দুল সালাম।


বিজ্ঞাপন


সালাম আর তার সঙ্গীদের মারধর করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা গেছে এক যুবক তিনজন প্রবীণ মুসলমানকে থাপ্পড় মারছেন। এ ঘটনায় অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অক্ষয় শর্মা ওরফে ছোট্টু নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল। তবে তিনি জামিন পেয়ে এখন জেলের বাইরেই রয়েছেন।

কী হয়েছিল সেদিন?


বিজ্ঞাপন


আব্দুল সালাম ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে আছেন। তার মোবাইলও বন্ধ আছে। তার অন্য দুই সঙ্গী আরিফ এবং জাভেদও সংবাদমাধ্যমের থেকে দূরেই রয়েছেন। সালাম অবশ্য বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘ঘটনা গত ১৬ ফেব্রুয়ারির। আমার দুই সঙ্গী আরিফ আর জাভেদকে নিয়ে রুদায়ন এলাকার ইসলামনগর থানা অঞ্চলে গিয়েছিলাম সাহায্য তুলতে। এক যুবক পিছন থেকে এসে আমাদের আধার কার্ড দেখতে চাইল। এরপরেই সে আমাদের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে, মারধর করে। মাথার টুপিও খুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বলছিল যে আমরা চোর।’ 

তার অভিযোগের ভিত্তিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। ইসলামনগর এলাকারই বাসিন্দা অক্ষয়কে গ্রেফতার করে হেফাজতে পাঠায় পুলিশ।

অভিযোগপত্রে লেখা হয়, আব্দুল সালাম আর তার দুই সঙ্গী রুদায়ন এলাকার মূল সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে এক ব্যক্তি হর্ন বাজায় কিন্তু তারা সেটা শুনতে পান নি। এ নিয়েই অশান্তি লাগে, মারধর করা হয়।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা সুনীল কুমার জানিয়েছেন, ‘সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশ রিপোর্ট দায়ের করে অভিযুক্তকে হেফাজতে পাঠিয়েছিল। তদন্ত চলছে।’ তবে পুলিশের কর্মকাণ্ডে অখুশি আব্দুল সালাম।

তিনি জানান, ‘মাদের ধর্ম তুলে কটু কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ করার চেষ্টা হয়েছিল, তবুও যে-সব ধারায় অভিযোগ দায়ের করা উচিত ছিল, পুলিশ তো তা করে নি। সেজন্য তো দ্রুত জামিন পেয়ে গেল। আমরা ঝগড়া বিবাদ চাই না, তবে ন্যায় বিচার তো পাওয়া উচিত।’

আব্দুল সালামের প্রতিবেশী শাকির আনসারি বলছিলেন, ‘ব্দুল সালাম খেটে খাওয়া মানুষ। তিনি রুদায়ন এলাকায় চাঁদা তুলতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে অন্য যে দুজন ছিলেন আরিফ আর জাভেদ, তারাও খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের ন্যায় বিচার পাওয়া উচিত।’

কে অভিযুক্ত অক্ষয় শর্মা?

ওই ঘটনায় অভিযুক্ত অক্ষয় শর্মা বা তার পরিবারের সঙ্গে চেষ্টা করেও কথা বলা যায় নি। অক্ষয়ের মোবাইলেও ফোন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তার মোবাইল বন্ধ ছিল।

পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে আব্দুল সালাম জানিয়েছেন, অভিযুক্ত নিজেকে বজরং দলের নেতা বলে এবং আধার কার্ড দেখতে চায়।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিবিসি যোগাযোগ করেছিল স্থানীয় বজরং দল নেতৃত্বের সঙ্গে। তবে অনেক চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায় নি।

তবে বদায়ুঁর সহসওয়ান এলাকা থেকে সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক ব্রজেশ ইয়াদভ অক্ষয় শর্মার ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অক্ষয় শর্মা গো-রক্ষা মিশন সংগঠনের জেলা সভাপতি। তার একটা নিয়োগপত্র আমার কাছেই আছে। এই ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমি সিনিয়র পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছি।’

এক স্থানীয় সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন, ‘অক্ষয়ের বয়স প্রায় ২১ বছর। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। চাষাবাদের কাজ করে।’ এর আগে এ ধরনের মারধরের কোনো ঘটনার সঙ্গে অক্ষয় শর্মা জড়িত ছিলেন না বলেই জানান ওই সাংবাদিক।

২০১৪ থেকে মুসলমানদের ওপরে হামলা বাড়ছে

নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল- বিজেপি ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালে। তারপর থেকেই মুসলমানদের নিগ্রহের ঘটনা বেড়ে চলেছে।

শুরুটা হয়েছিল বাড়িতে গোমাংস রাখা বা গণপরিবহনে গোমাংস বহন করার অভিযোগ তুলে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার একাধিক ঘটনা। এরপরে শুরু হয় গরু ব্যবসায়ীদের মারধর ও গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার একের পর এক ঘটনা।

বাজার থেকে বৈধ পথে চাষের জন্য বা পালন করার জন্য গরু নিয়ে যাওয়ার সময়েও অনেক মুসলমানকে গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে তথাকথিত ‘গো-রক্ষকদের’ হাতে।

আবার নানা মসজিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে এই বলে যে সেগুলি নাকি হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছিল ভারতে মুসলমান শাসনামলে। এছাড়াও কখনও ‘লাভ-জিহাদ’ বা ‘ফ্লাড জিহাদ’ এর মতো শব্দ চয়ন করে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। এতে উস্কানি দিয়েছে ডানপন্থি মূলধারা কিছ গণমাধ্যমও।

বছর দুয়েক আগে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে ভারতে যে-সব এলাকায় মুসলিম বিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে- তার তিন-চতুর্থাংশ বিজেপি শাসিত অঞ্চলগুলোতে ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ওই প্রতিবেদনেই ‘বিয়িং মুসলিম ইন হিন্দু ইন্ডিয়া’ বইটির লেখক জিয়া উস সালামকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছিল, ‘ভারতের মুসলমান জনগোষ্ঠী যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়েছেন, তারা নিজের দেশেই অদৃশ্য সংখ্যালঘু।’ তবে বিজেপি এবং মোদি ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করে থাকে। বিবিসি বাংলা

 

এমএইচআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর