মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে একচেটিয়া ভাবে বিজয়ী হয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী-সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মিয়ানমারের পার্লামেন্টের দুটি কক্ষেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ইউএসডিপি। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার প্রকাশিত ফলাফল অনুসারে, নিম্ন কক্ষ- পাইথু হ্লুটাও হাউসে ২৬৩টি আসনের মধ্যে ২৩২টি এবং উচ্চ কক্ষে- অ্যামিওথা হ্লুটাও হাউসে এখন পর্যন্ত ঘোষিত ১৫৭টি আসনের মধ্যে ১০৯টি আসন পেয়েছে দলটি।
বিজ্ঞাপন
এরআগে গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয় প্রথম দফার ভোটগ্রহণ এবং গত রোববার (২৫ জানুয়ারির) চূড়ান্ত দফার ভোটের মাধ্যমে তিন ধাপের সাধারণ নির্বাচনের সমাপ্তি ঘটে।
জান্তা নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপ জান্তা মুখপাত্র জাও মিন টুনের বরাতে দিয়ে জানিয়েছে, মিয়ানমারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আগামী মার্চ মাসে প্রেসিযেন্ট নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন এবং এপ্রিলে একটি নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক ও সমালোচকরা ধারণা করছেনে, নতুন পার্লামেন্ট গঠনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন বর্তমান সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং।
তাদের মতে, প্রায় মাসব্যাপী চলা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা, আগেভাগেই সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে দিয়েছে। এই ‘পাতানো’ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শাসনের বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করছে।
বিজ্ঞাপন
এই নির্বাচনকে শুরু থেকেই একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বলছে, এই ভোটগ্রহণ কোনোভাবেই অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। কারণ দেশটি গণতন্ত্রকামী নেত্রী ৮০ বছর বয়সি অং সান সু চি বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) আগেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে প্রধান বিরোধী দল ছাড়াই এই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলো। দেশটির ৩৩০টি জনপদের মধ্যে সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকায় কোনো ভোটগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া মিয়ানমারের সংবিধানে ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকায় পার্লামেন্টে তাদের নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল।
এদিকে ১১ সদস্যের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংগঠন- আসিয়ান আগেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না এবং কোনো পর্যবেক্ষকও পাঠায়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, জনসংখ্যার একটি বড় অংশ, যার মধ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারাও রয়েছে, তাদের ভোটদান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে কারণ তাদের নাগরিকত্ব নেই অথবা তারা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অনেক মানুষ কেবল ভয়ের কারণে ভোট দেওয়া বা না দেওয়া বেছে নিয়েছেন’।
ওএইচসিএইচআর আরও বলেছে, নির্বাচনের সময় জান্তার বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৭০ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এবং প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তারা এখন পর্যন্ত যাচাই করেছে।
অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকার জোর দিয়ে বলছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং জনসাধারণের সমর্থন পেয়েছে। তবে নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের অনুরোধের জবাব দেয়নি তারা।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সু চির দল এই নিবার্চনে জয়লাখ করে সরকার গঠন করে। তবে মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভোটে কারচুটির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ দাবি করে দেশটির সেনাবাহিনী এবং রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এর পর থেকেই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর

