প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকোতে বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা হয়েছে মালয়েশিয়া। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে আগত যাত্রীদের কঠোর স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বানার্মা জানিয়েছে, নিপা ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি জোরদার করার জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই ঘোষণা দিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার একটি হেলথ স্ক্রিনিং মোবাইল ইউনিট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাতুক সেরি ডা. জুলকেফ্লাই আহমেদ বলেছেন, মালয়েশিয়াজুড়ে সমস্ত বিমানবন্দরসহ অনান্য সব আন্তর্জাতিক প্রবেশপথেও এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, ভ্রমণকারীদের মধ্যে জ্বরের মতো প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করার জন্য শরীরের তাপমাত্রা স্ক্যানিং সিস্টেম সক্রিয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে আগত ভ্রমণকারীদের ওপর বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছি, কারণ এগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। আমরা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছি এবং সমস্ত প্রবেশপথে স্ক্রিনিং অব্যাহত রয়েছে। যদি কোনো ভ্রমণকারীর মধ্যে জ্বরের মতো লক্ষণগুলো শনাক্ত করা হয়, তবে তাদের আরও পরীক্ষার জন্য রেফার করা হবে।’
ডিজুলকেফ্লাই আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যাতে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
বিজ্ঞাপন
এরআগে ভারতে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের পর থাইল্যান্ড, নেপাল এবং তাইওয়ানসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কোভিড-ধাঁচের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত যাত্রীদের কঠোর স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এসব যাত্রীর তাপমাত্রা স্ক্যান, স্বাস্থ্য পরিক্ষা এবং লক্ষণযুক্ত ভ্রমণকারীদের জন্য কোয়ারেন্টাইনের মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে দেশগুলো।
বিবিসি জানিয়েছে, থাইল্যান্ডের তিনটি বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব ফ্লাইট আসছে সেগুলোর যাত্রীদের বাড়তি স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। এছাড়া নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এরসঙ্গে ভারতের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে তারা।
অন্যদিকে তাইওয়ান নিপাহ ভাইরাসকে একটি শীর্ষ-স্তরের নোটিফাইয়েবল রোগ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে।
প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এরপরই তাদের সংস্পর্শে আসা ১১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।
ভারতের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও দেশটির দক্ষিণী রাজ্য কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ দেভা গেছে। কর্তৃপক্ষ সেখানে ১০০ থেকে ২০০ জনের তদন্ত করছে যারা নিপা ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কী এই নিপাহ ভাইরাস
নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস। অর্থাৎ পশু থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসটি এসেছে, যা মূলত সংক্রামিত শূকর এবং বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি Henipavirus জেনাসের অন্তর্গত একটি ভাইরাস, যা মস্তিষ্ক বা শ্বসনতন্ত্রে প্রদাহ তৈরির মাধ্যমে মারাত্মক অসুস্থতার সৃষ্টি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বে যে ১০টি রোগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি নিপাহ ভাইরাস। কারণ প্রতিবছর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারায়।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় সর্বপ্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে শূকরের খামারে কাজ করা চাষীদের মাধ্যমে প্রথম ছড়িয়েছিল ভাইরাসটি। আক্রান্ত শূকরের স্পর্শ, তাদের লালা এবং সংক্রমিত মাংসের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটে। পরবর্তীতে রোগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় ১০০ মানুষ এ ভাইরাসে প্রাণ হারান। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে লাখ লাখ শূকর হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। আর ২০০১ এবং ২০০৭ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল।
সূত্র: বার্নামা
এমএইচআর

