যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সাগরের পানির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে ইরান। সমুদ্রের তলদেশে এই টানেলে শত শত দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করে রেখেছে দেশটি।
মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পানির নিচের এই ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি এক সাংবাদিককে বিস্তৃত সাবমেরিন ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, টানেলের ভেতেরে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এসময় তাংসিরি দাবি করেন, আইআরজিসি নৌবাহিনীর সমুদ্রের তলদেশে ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে মোতায়েন শত্রু যুদ্ধজাহাজের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, টানেলগুলোতে শত শত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা ১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি (প্রায় ৬২১ মাইল)। এরমধ্যে অন্যতম হলো- আইআরজিসি নৌবাহিনীর নির্মিত ‘কাদের ৩৮০ এল’ ক্ষেপণাস্ত্র। এটিতে স্মার্ট গাইডেন্স রয়েছে, যা আঘাত না করা পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম।
This is reportedly an📷 Iranian underwater bunker, located deep beneath seabed in Persian Gulf where thousands of anti-ship missiles are reportedly being deployed. pic.twitter.com/kO8sydsApD
— Peoples Chronicles (@PChroniclesNG) January 27, 2026
যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আইআরজিসির এই নৌ কমান্ডার আরও বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে, ইরানি বাহিনী যেকোনো স্তরে এবং যেকোরো অবস্থান থেকে হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে’।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আরও একটি বিশাল নৌবহর আসছে জানিয়ে ইরানকে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, তেহরানকে শিগগিরই একটি পারমানবিক চুক্তি করতে হবে, অন্যথায় গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যে হামলা হয়েছিল, এবার তার চেয়েও ভয়াবহ হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘বিশাল এক যুদ্ধজাহাজের বহর ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দুর্দান্ত শক্তি, উৎসাহ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এটি বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এর আগে ভেনেজুয়েলায় যে বাহিনী পাঠানো হয়েছিল, বিশাল রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’-এর নেতৃত্বে থাকা এই বহরটি তার চেয়েও বড় এবং ভেনেজুয়েলার মতো অভিযানের জন্য প্রস্তুত। যা প্রয়োজন পড়লে অনেক দ্রুত এবং ভয়াবহ হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।’
তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত চুক্তিতে রাজি হবে। তারা কোনো পরমাণু অস্ত্র রাখতে পারবে না, যা সকল পক্ষের জন্য মঙ্গলজনক।’
ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সময় ফুরিয়ে আসছে, এটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ! আমি ইরানকে আগেও বলেছি, একটা সমাধানে আসুন। তারা শোনেনি বলেই গত জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ হয়েছিল, যা ইরানের জন্য একটি বড় ধ্বংসযজ্ঞ ছিল। পরের বার হামলা হলে এটি আরও ভয়াবহ হবে! তেমন পরিস্থিতি ডেকে আনবেন না। এই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ!’
ইতোমধ্যেই ইরানের আরও কাছে পৌঁছেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ।
মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মার্কিন বিমান বাহিনী মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বহু-দিনের প্রস্তুতি মহড়া পরিচালনা করবে, যাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এলাকা জুড়ে যুদ্ধ বিমান মোতায়েন, শত্রু বিমান বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকে থাকার ক্ষমতা পরীক্ষা করা যায়। বেশ কিছুদিন এই মহড়া চলবে।’
এরআগে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম উত্তেজনার মধ্যেই একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই ইরান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে দেশটিতে ব্যাপক হামালার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জন্য প্রয়োজনীয় সামারিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের সরবরাহ বাড়িয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওই কর্মকর্তা বলেছেন, এ সপ্তাহে শেষের দিকেই হামলা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সেই সময় পরিবর্তনও হতে পারে।
তিনি আরও জানান, ‘ইরানে হামলা চালালে দেশটির পাল্টা প্রতিক্রিয়া কেমন হবে- তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা চলছে, তবে এ নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।’
অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে লাইভ-ফায়ার মহড়া করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটির সরকার।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে রেখেছে তেহরান। এরপরই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছে তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনও সামরিক অভিযানে তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড এবং জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
সূত্র: দ্য নিউ আরব
এমএইচআর

