চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের উদ্দেশে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের একটি বিশাল বহর পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের পরই যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাব দিতে ইরানি বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের সরাসরি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘আইআরজিসি মনে করে যে ইরানে হামলার ব্যাপারে যাবতীয় বিভ্রান্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র ইসরায়েলের মুক্ত থাকা উচিত। একইসঙ্গে গত বছর জুন মাসে তাদের চাপিয়ে দেওয়া ১২ দিনের সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান স্মরণে রাখা উচিত। তারা যদি সেই স্মৃতি ভুলে যায়— তাহলে খুবই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক পরিণতি ভোগ করছে তাদের জন্য।’
বিজ্ঞাপন
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই— ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং আমাদের প্রিয় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আঙুল তাদের বন্দুকের ট্রিগারে আছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ইরান অনেক বেশি প্রস্তুত এবং আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও শীর্ষ কমান্ডার ইন চিফের (আয়াতুল্লাহ খামেনি) আদেশ পালনের জন্য তৈরি।’
এরআগে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি বিশাল নৌবহর পারস্য উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি আর্মাদা (যুদ্ধজাহাজের বড় বহর) ইরানের উদ্দেশে পাঠিয়েছি। যদি প্রয়োজন পড়ে…মানে আমি বলছি না যে কোনো কিছু ঘটতে যাচ্ছে, হয়তো এই বহর আমাদের ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না, তবে আমরা তাদের (ইরান) নিবিড় নজরদারির মধ্যে রাখছি।’
বিজ্ঞাপন
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিমান বহকারী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম এবং বেশ কিছু গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ ইরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে এবং আগামী কিছুদিনের মধ্যে ইরানের উপকূলের আশেপাশে এই যুদ্ধজাহাজের বহর অবস্থান নেবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছন, অদূর ভবিষ্যতে যে কোনো সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে ইরান। সেসব হামলা ঠেকাতে আগাম সতর্কতা হিসেবে এই যুদ্ধজাহাজের বহরে কিছু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম পাঠানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই বহরে রয়েছে বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরক।
অন্যদিকে, প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানে হামলার প্রস্তুতি বাদ দিতে বললেও এখন আবার নতুন পরিকল্পনা দিতে বলছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানে হামলার ব্যাপারে আলোচনার সময় এটিকে তিনি কয়েকবার চূড়ান্ত হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার নির্দেশনার পর হোয়াইট হাউজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ‘অপশন’ দিয়েছেন। যারমধ্যে ইরানের সরকার পতনের পরিকল্পনাও আছে।
ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ইতিমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করেছে।
শীপ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, রণতরীটি এখন ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছাতে মাত্র ২-৩ দিন সময় লাগবে।
এরআগে বুধবার একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘তেহরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ওই দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করা হবে।’
তিনি আরও জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থগিত করা হয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রতিফলন। ফলে ইরান এসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলা ঠেকাতে চেষ্টা করার অনুরোধও জানিয়েছে।
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স
এমএইচআর

