সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

৬৬ সংস্থা থেকে সরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

T
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা।

জাতিসংঘের বেশ কিছু সংস্থাসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির ‘ক্ষ্যাপাটে’ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনটা হলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কী প্রভাব পড়বে, সেটা এখন বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তৈরি হয়েছে উদ্বেগও। 

এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যেসব সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু চুক্তি ছাড়াও মানবাধিকার, গণতন্ত্র, লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে- এমন বৈশ্বিক সহযোগিতা সংস্থাও রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারকের মাধ্যমে এসব সংস্থার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় বৈশ্বিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন চুক্তিসহ (ইউএনএফসিসিসি) জাতিসংঘেরই ৩১টি সংস্থার নাম আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো থেকে বেরিয়ে গেছেন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে তার দেশের অংশগ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর আগে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার কারণে বহুপাক্ষিক এসব প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে এবং এর ফলে বাণিজ্য, মানবিক, শিক্ষা ও জলবায়ুর মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সুরক্ষা পেত, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে অন্য ধনী ও প্রভাবশালী দেশগুলোও এ ধরনের বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে অর্থায়ন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে বিদেশে মার্কিন সহায়তা স্থগিত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। পরে এর ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ ঘোষণা করেন তিনি। যার ফলে বাংলাদেশে সংস্থাটির অর্থায়নে পরিচালিত অনেক প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।


বিজ্ঞাপন


কোন সংস্থাগুলো থেকে সরছেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ৬৬ সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণার পর হোয়াইট হাউজ বলেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হলো, ‘এসব সংস্থা আর আমেরিকান স্বার্থ রক্ষা করছে না’ এবং ‘অকার্যকর ও বৈরি এজেন্ডা প্রচার করছে’।

2
জলবায়ু পরিবর্তন জনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। ছবি- সংগৃহীত

এসব সংস্থাগুলোর মধ্যে কয়েকটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে আসছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে থাকা দেশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ।

এছাড়া আরও কিছু সংস্থা রয়েছে যারা শিক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে কাজ করছে। বাংলাদেশেরও বিভিন্ন সংস্থা এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর হোয়াইট হাউজ এসব সংস্থার কাজকে ‘করদাতাদের অর্থের অপচয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন চুক্তিসহ (ইউএনএফসিসিসি) ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি থেকেও সরে যাচ্ছে।

এটি বিশ্বের জলবায়ু বিজ্ঞান বিষয়ে অন্যতম প্রধান কর্তৃপক্ষ, যারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক তথ্য নিয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলোর সংকলন করে। এখন আইপিসিসি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে দেশটির জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এতে জড়িত থাকবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

3
ইউএসএইডের কার্যক্রম আগেই বন্ধ হয়েছে

এর বাইরেও জাতিসংঘের যে ৩১টি সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাচ্ছে, তার মধ্যে আছে- ইন্টারন্যাশনাল ল কমিশন, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টার, পিসিবিল্ডিং কমিশন, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, জাতিসংঘ গণতন্ত্র তহবিল এবং ইউএন ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান।

জাতিসংঘের বাইরে যে ৩৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাচ্ছে তার মধ্যে আছে- ২৪/৭ কার্বন ফ্রি এনার্জি কমপ্যাক্ট, কমিশন ফর এনভায়রনমেন্টাল কোঅপারেশন, গ্লোবাল কাউন্টারটেররিজম ফোরাম, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম এবং আন্তর্জাতিক সৌর জোটের মতো সংস্থা।

বাংলাদেশে কতটা প্রভাব পড়বে

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের কারণে গত বছরের জানুয়ারিতে ইউএসএইডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ আসত এই ইউএসএইডের মাধ্যমে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বৈদেশিক সহায়তা সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশকে প্রতি বছর দেওয়া সহায়তার পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। এর আগের বছরগুলোতে আড়াইশো থেকে তিনশো মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ।

এই অর্থ যেসব খাতে ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা, পরিবেশ ও জ্বালানি এবং মানবিক সহায়তা। এছাড়া রোহিঙ্গাদের জরুরি সহায়তার জন্যও বরাদ্দ ছিল। এখন রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাকি সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাংলাদেশে বন্ধই হয়ে গেছে।

এখন নতুন করে যে ৬৬টি সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সংকট মোকাবিলায় নেওয়া নানা কার্যক্রম ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলছেন, ‘বহুপাক্ষিক এসব সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সরে দাঁড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রই এসব সংস্থার প্রধান অর্থায়নকারী দেশ। বাংলাদেশের ওপর এর বড় রকমের আঘাত আসবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সহায়তা গ্রহণকারী দেশ না। কিন্তু এসব সংস্থার কারণে বাণিজ্য ও মানবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইনে অনেক কিছুতে সুরক্ষা পায় বাংলাদেশ। এখন আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য তৈরি হতে পারে।’

অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে আবারও বিশ্বে বিভিন্ন ‘ব্লক বা অ্যালায়েন্স পলিটিকস’ সামনে আসবে, যাতে করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

4
ইউনেস্কো থেকে আগেই সরে গেছে যুক্তরাষ্ট্র

তাছাড়া বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিক খাদ্য ও স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক যে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল, সেটি দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে করা হয়।

আবার ফান্ড ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু বিষয়ক অন্য সংস্থাগুলোর কারণে বাংলাদেশের জলবায়ুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও নৈতিক অবস্থান বিশ্বের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছিল। এখন এই সংস্থাগুলো দুর্বল হলে তাতে বাংলাদেশের এই কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

সাহাব এনাম খান বলেন, ‘বাংলাদেশ করোনার সময় ভ্যাকসিন পেয়েছিল বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনাতেই। এসব ফোরামগুলো সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো থেকে সরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হয়তো অনুকূল সিদ্ধান্ত, কিন্তু যে কাঠামোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার হয়, তাতে ঝুঁকি তৈরি হলো।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘আমেরিকার সরে দাঁড়ানোর প্রতীকী মূল্যই অনেক কারণ। আমেরিকা সরে দাঁড়ালে অন্য ধনী দেশগুলোও এসব কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর অজুহাত পেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র উন্নত বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে দারিদ্রতা, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তনসহ গ্লোবাল ইস্যু বা গ্লোবাল পাবলিক গুডসের ক্ষেত্রে অর্থায়নে এগিয়ে আসবে, এটাই সবাই আশা করে।’

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘গ্লোবাল কমিউনিটির এজেন্ডার সঙ্গে আমেরিকার বর্তমান প্রশাসন একটি সামাজিক দূরত্ব তৈরি করছে এবং এর ফলে বৈশ্বিক স্বার্থের বদলে যারা একা চলতে চায় তারাই উৎসাহিত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষার জন্য। এখানে আমেরিকার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা না থাকলে দুটি সংকট হবে- একটি হলো অর্থায়নের সংকট, অন্যটি গ্লোবাল কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধ থাকা চ্যালেঞ্জে পড়বে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে বড় বিভক্তিরও সূচনা হলো।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর