যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বড় শহর মিনিয়াপোলিসের পাশের একটি আবাসিক এলাকায় অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বিভাগ সংক্ষেপে আইসিই নামে পরিচিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে ওই এলাকায় চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই বুধবার এ ঘটনা ঘটে। সূত্র: আল জাজিরা।
বিজ্ঞাপন
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি কালো রঙের এসইউভি গাড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। একপর্যায়ে গাড়িটি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে গাড়িটি সামান্য পেছনে গিয়ে আবার সামনে এগোতেই এক কর্মকর্তা গুলি ছোড়েন।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের (ডিএইচএস) মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন, ওই নারী তার গাড়িকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করছিলেন।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘একজন আইসিই কর্মকর্তা নিজের জীবন, সহকর্মীদের জীবন এবং জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়েছেন।’ তিনি ঘটনাটিকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের’ ঘটনা হিসেবেও উল্লেখ করেন।
তবে মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডেমোক্র্যাট দলের এই মেয়র বলেন, আইসিই কর্মকর্তা ‘বেপরোয়াভাবে’ গুলি করেছেন এবং অভিবাসন কর্মকর্তারা শহরে ‘অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন।’
বিজ্ঞাপন
এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র ফ্রে বলেন, ‘তারা পরিবারগুলোকে ছিন্নভিন্ন করছে। আমাদের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে এবং এই ঘটনায় আক্ষরিক অর্থেই মানুষ হত্যা করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তারা ইতোমধ্যে এটিকে আত্মরক্ষার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি নিজে ভিডিও দেখেছি। আমি সরাসরি সবাইকে বলতে চাই ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজও এই গুলির ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অনুমেয়’ ও ‘সম্পূর্ণ এড়ানো যেত’ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, ন্যাশনাল গার্ডকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
নিহত নারীর নাম রেনে নিকোল গুড। ৩৭ বছর বয়সী নিকোলের মা ডোনা গ্যাঙ্গার বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। সারাজীবন মানুষকে যত্ন করেছে। সে ছিল ভালোবাসাময়, ক্ষমাশীল ও স্নেহশীল। সে ছিল একজন অসাধারণ মানুষ।’
তদন্ত সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গুলির পর নিকোল গুডের এসইউভি গাড়ির উইন্ডশিল্ডে গুলির ছিদ্র এবং ভেতরে রক্তের দাগ দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ভেনাস ডি মার্স জানান, তিনি দেখেছেন জরুরি চিকিৎসাসেবাকর্মীরা সড়কের পাশের বরফের স্তূপের কাছে পড়ে থাকা এক নারীর ওপর সিপিআর দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলেও কোনো সাইরেন বাজানো হয়নি।
তিনি আরো বলেন, ‘এ এলাকায় আগে অনেক আইসিই তৎপরতা দেখেছি, কিন্তু এমন কিছু কখনো দেখিনি। আমি খুবই ক্ষুব্ধ ও অসহায় বোধ করছি।’
মিনেসোটা পাবলিক রেডিওকে প্রত্যক্ষদর্শী এমিলি হেলার বলেন, ঘটনার সময় আইস এজেন্টরা গাড়ির চালককে ‘এখান থেকে চলে যান’ বলে চিৎকার করছিলেন।
হেলারের ভাষ্য অনুযায়ী, নারীটি গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন এক আইসিই কর্মকর্তা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বন্দুক বের করে গাড়ির বনেটের ওপর ঝুঁকে একাধিকবার গুলি করেন।
উত্তেজনা ও বিক্ষোভ
অভিবাসন অভিযান ঘিরে এই ঘটনাকে চলমান উত্তেজনার বড় ধরনের বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল নিয়ে গঠিত ‘টুইন সিটিজ’ এলাকায় ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) মঙ্গলবার ২ হাজার কর্মকর্তা মোতায়েনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি ছিল থমথমে।
গুলির ঘটনার পরপরই বিক্ষোভকারীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তারা ‘লজ্জা, লজ্জা’ এবং ‘আইসিই, মিনেসোটা ছাড়ো’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে গ্যাস মাস্ক পরা ভারী অস্ত্রধারী ফেডারেল এজেন্টরা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে রাসায়নিক গ্যাস ছোড়েন।
যে এলাকায় এই গুলির ঘটনা ঘটে, সেটি শহরের কেন্দ্রের দক্ষিণে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা। সেখানে রয়েছে বহু পুরোনো অভিবাসী বাজার। এলাকাটি ২০২০ সালে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নিহত হওয়ার স্থান থেকে প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরে। ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পুলিশি সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে।
এমআর

