শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

মার্কিন ভিসা বন্ড: বাংলাদেশিরা যেসব সমস্যায় পড়বেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

মার্কিন ভিসা বন্ড: বাংলাদেশিরা যেসব সমস্যায় পড়বেন

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড বা জামানত জমা দিতে হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ভিসা বন্ডের আওতাভুক্ত দেশগুলোর হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে। নতুন তালিকায় বাংলাদেশসহ মোট ৩৮টি দেশ রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নিয়ম ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশের কেউ যদি ব্যবসায়িক ভিসা (বি১) এবং পর্যটন বা ভিজিট ভিসায় (বি২) আবেদন করেন এবং তারা যদি এই দুই ভিসা পাওয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন হন, তাহলে তাকে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ছয় থেকে ১৯ লাখ টাকা জামানত হিসেবে দিতে হবে যা অনেকের জন্যই বাড়তি চাপ বিবেচিত হবে।

ভিসা বন্ড কী

ভিসা বন্ড হলো এক ধরনের আর্থিক জামানত, যা ফেরতযোগ্য। দুই ক্যাটাগরিতে অস্থায়ী ভিসা দেওয়ার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এই বন্ড বা জামানত নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর শিক্ষার্থী, পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের বিপুল সংখ্যক ভিসা দিয়ে থাকে। এসব ভিসার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। যারা ভিসা পাবেন তারা যেন নির্ধারিত সময়ের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন, সেজন্যই এই সিদ্ধান্ত। কেউ অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে তা দেশটির অভিবাসন আইন বা ভিসা বন্ডের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।


বিজ্ঞাপন


নিয়ম অনুযায়ী, এই ৩৮ দেশের নাগরিকদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার জন্য পাঁচ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত 'ভিসা বন্ড' বা জামানত জমা দিতে হতে পারে। আর, ভিসার সাক্ষাৎকারের সময়ই ঠিক করা হবে বন্ডের পরিমাণ কত হবে। এটি নির্ধারিত হবে তিন ধাপে। পাঁচ হাজার, ১০ হাজার অথবা ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।

কার কত পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, তা নির্ধারণ করবে ভিসা কর্মকর্তা। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও ইন্টারভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে তিনি এটি নির্ধারণ করবেন। আবার তিনি চাইলে কাউকে বন্ডের আওতার বাইরে রেখেই বি১ বা বি২ ভিসা দিতে পারেন।

বাংলাদেশের একটি বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক কামরুজ্জামান রনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যখন ভিসা অফিসার নিশ্চিত হবে যে আপনাকে ভিসা দেবে, তখনই আপনাকে টাকা জমা দিতে বলবে। বিষয়টা এমন না যে আবেদন করার সময়ই আপনাকে টাকা দিতে হবে।

বন্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া, নির্দেশ ছাড়া জমা নয়

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে বলা হয়েছে, কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীকে নির্দেশ দেওয়ার পরে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আই-৩৫২’ ফর্ম জমা দিতে হবে। তাদেরকে পে.গভ (Pay.gov) নামের যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বন্ডের শর্তে সম্মতি জানাতে হবে। এই নিয়ম ওই দুই ক্যাটাগরির সবার জন্য প্রযোজ্য।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর আরও বলেছে, বন্ড জমা দিতে কোনো তৃতীয়-পক্ষের ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে না। মার্কিন সরকারের নিজস্ব সিস্টেমের বাইরে কোনো জায়গায় অর্থ পরিশোধ করলে তার জন্য মার্কিন সরকার দায়ী থাকবে না।

আর কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশ ছাড়া কেউ যদি বন্ড ফি পরিশোধ করেন, তাহলে সেই অর্থও ফেরত দেওয়া হবে না। কনস্যুলার কর্মকর্তা বন্ড জমা দিতে বললে তখন আবেদনকারীকে পেমেন্ট করার একটি সরাসরি লিংক পাঠানো হবে। তাতে প্রবেশ করে অর্থ জমা দিতে হবে।

যদিও তারা জানিয়েছে যে বন্ড জমা দেওয়া মানেই ভিসা পাওয়া নিশ্চিত না। কিন্তু কামরুজ্জামান রনির ভাষ্য, ‘শুরুতে যে সাত দেশের জন্য বন্ড প্রযোজ্য ছিল, তাদের ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া আমরা স্টাডি করে দেখেছি, বন্ড দিতে বলা মানেই ভিসা নিশ্চিত।’

বন্ডের টাকা ফেরত পাওয়া যখন জটিল হবে

বন্ড জমা দিয়ে যারা ভিসা পাবেন, তাদের জন্য বিমানবন্দর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো– বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (বিওএস), জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (জেএফকে) যা নিউইয়র্কে নিউইয়র্কে অবস্থিত এবং ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (আইএডি)।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কিংবা ত্যাগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য এই তিন বিমান বন্দর বরাদ্দ এখন। এর বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে বা বের হতে পারবেন না, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে গন্তব্য যেখানেই হোক না কেন। যদি কেউ অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করে বা বের হন, তাহলে তা বন্ডের নিয়ম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং বন্ডের টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করবে।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে যতদিনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, ভ্রমণকারী যদি সেই নির্ধারিত সময়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন; বা, যদি অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন সে দেশে অবস্থান করেন; অথবা থেকে যান; কিংবা আশ্রয় বা অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করেন, তাহলে বন্ডের শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করতে যুক্তরাষ্ট্র।

এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য মার্কিন অভিবাসন দপ্তরে পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ। তবে ভিসাধারী অনুমোদিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করলে বা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর থেকে ঢোকার অনুমতি না পেলে বন্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং জমা দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে। তবে কতদিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়া হবে, তা জানানো হয়নি।

বন্ড ব্যবস্থা চালুর কারণ

অভিবাসন ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নীতিতে শুরু থেকেই সোচ্চার। গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন ঠেকাতে একের পর এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।

জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই অবৈধভাবে বসবাস করা পিতামাতার সন্তানদের জন্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সুবিধা বন্ধ করে আদেশ জারি করেছিলেন তিনি। সেসময় হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়। অভিবাসন ঠেকাতে জানুয়ারি থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে তিনি কড়াকড়ি আরোপ করেন।

গত মার্চে কিউবা, হাইতি, নিকারাগুয়া এবং ভেনেজুয়েলা থেকে আসা পাঁচ লাখ ৩০ হাজার অভিবাসীর অস্থায়ী বৈধতা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে গত সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দক্ষ বিদেশি কর্মী হিসেবে বা এইচ-ওয়ানবি ভিসা প্রোগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র যেতে আবেদনকারীদের বাড়তি এক লাখ ডলার গুণতে হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'পিউ রিসার্চ সেন্টারের' রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বেড়েছে ১৬ লাখ। গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ে অভিবাসনের ক্ষেত্রে এত বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশেরও বেশি মানুষ অভিবাসী, ১৯১০ সালের পর থেকে এটাই রেকর্ড পরিমাণ অভিবাসন। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেও ভিসা বন্ড কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন, কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে ভ্রমণ সীমিত হয়ে যাওয়ায় পরে আর সেটি কার্যকর করা যায়নি।

বাংলাদেশের ওপর কীভাবে প্রভাব পড়বে

মোটা অংকের ওই ভিসা বন্ডের খবরে মার্কিন ভিসাপ্রত্যাশী ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বেশ কয়েকজন শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, কোথাও যাওয়ার জন্য এত বিপুল পরিমাণ টাকা ফেলে রাখা অনেক পরিবারের জন্যই কঠিন হবে।

কামরুজ্জামান রনির মতে, ভিসা বন্ডের কারণে বিদেশ ভ্রমণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত যাত্রীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ট্যুরিস্ট ও ভিজিট ভিসার আবেদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইন, ট্যুর অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট সেবাখাতে। বৈধ ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের বিদেশ ভ্রমণের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ 

বাংলাদেশের নাম ওই তালিকায় ওঠা মানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিরও ক্ষতি, এমনটাই মনে করেন তিনি।

রনি বলেন, ‘বিদেশে বার্তা যেতে পারে যে বাংলাদেশি যাত্রীরা হাইরিস্ক। এতে অনান‍্য দেশের ভিসা প্রক্রিয়া আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।’ 

উল্লেখ, এই তালিকায় কিউবা, ভেনেজুয়েলা, কঙ্গো,আলজেরিয়া, জিবুতি, ফিজি, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়েসহ আরও অনেক দেশ আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল ও ভুটানের মতো দেশও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিবিসি বাংলা

এমএইচআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর