বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ভোটের আগে একের পর এক মন্দির উদ্বোধন মমতার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ভোটের আগে একের পর এক মন্দির উদ্বোধন মমতার

চলতি বছরের মার্চ–এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই রাজ্যের সৈকত শহর দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন, গত সপ্তাহে কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গন পরিসরের শিলান্যাসের পরে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে শিলিগুড়িতে একটি মহাকাল মন্দির পরিসরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 


বিজ্ঞাপন


এছাড়াও সম্প্রতি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বেশ কয়েকটি তীর্থস্থানের পরিকাঠামো উন্নয়নও করেছে তার সরকার। এর মধ্যে সর্বশেষ প্রকল্পটির উদ্বোধন করেছেন তিনি গত সোমবার। বঙ্গোপসাগরের তীরে গঙ্গাসাগরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগের জন্য ১৭০০ কোটি ভারতীয় টাকার মূল্যের একটি সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন তিনি।

বিজেপি যে তার দিকে মুসলমান তোষণের রাজনীতি করেন বলে আঙ্গুল তুলত, সেই তকমা কাটানোই কি এই হিন্দু ধর্মীয় পরিসরগুলো গড়ছে তৃণমূল সরকার? সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই সব উদ্যোগ কি কয়েকমাসের মধ্যে হতে চলা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে আরও কিছু হিন্দু ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা?

তার দল বলছে অযোধ্যায় যখন রাম মন্দির গড়া এবং তার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন, তখন তো এসব প্রশ্ন ওঠে না!

আর বিজেপি বলছে, খুবই সুখবর যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্দির গড়ছেন, কিন্তু তিনি বড় দেরি করে ফেলেছেন।


বিজ্ঞাপন


বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছেন, আরও কিছু হিন্দু ভোট টানার উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যে ‘নরম হিন্দুত্বের পথ’ নিয়েছেন, সেই প্রচেষ্টা দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা ছত্তিশগড়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল, এমনকি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীরাও করেছিলেন, তবে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। ‘হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগ’ কীভাবে ভোটে রূপান্তরিত করা যায়, সে ব্যাপারে বিজেপি বহুগুণ বেশি পারদর্শী।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্লেষকরা দেখাচ্ছেন যে, নাগরিকত্ব, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার বা সর্বশেষ মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো ইস্যুগুলিকে লাগাতার বিজেপি তুলে ধরছে – যাতে 'হিন্দু ভাবাবেগ' ব্যবহার করা যায় ভোটযন্ত্রে।

মন্দির গড়তে কী কী প্রকল্প মমতা ব্যানার্জীর?

গত বছর এপ্রিল মাসে সৈকত শহর দীঘায় এক নতুন জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরে গত সোমবার কলকাতা লাগোয়া নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস করেন তিনি। প্রায় ১৭ একর জমির ওপরে দুর্গা অঙ্গনটি গড়ে উঠবে। সেখানে মন্দিরের পাশাপাশি গড়া হবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও।

ইউনেস্কো আগেই কলকাতার দুর্গাপুজোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন সরকার চাইছে দুর্গা অঙ্গনকে কেন্দ্র করে যাতে আরও পর্যটক আকৃষ্ট করা যায়। ইতোমধ্যেই কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে দ্বিতীয় সব থেকে পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

ওই শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেছিলেন, ‘অনেকে আমাকে তোষণের রাজনীতির জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু আমি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ। প্রতিটা ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি আমি। এমন একটাও ধর্মীয় উৎসব দেখাতে পারবেন না যেখানে আমি যাই না। গুরদোয়ারায় গেলে কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে নিই। রোজায় যখন যাই তখন কেন আপত্তি ওঠে? প্রতিটা ধর্মের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেগুলোর কোনও একটিকে আমি অশ্রদ্ধা কেন করব?’

image

দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাসের আগেই মমতা ঘোষণা করেছিলেন যে উত্তরাঞ্চলীয় শহর শিলিগুড়িতে একটা মহাকাল মন্দির গড়া হবে। হিন্দুদের উপাস্য মহাকাল শিবেরই আরেকটি নাম। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের শৈল শহর দার্জিলিংয়ে একটি প্রাচীন ও বিখ্যাত মহাকাল মন্দির আছে।

গত বছর নভেম্বর মাসে রাজ্য মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকায় মহাকাল মন্দির এবং সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হবে। মন্দিরের জন্য ২৫ একর জমি এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য আরও তিন একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র ১৬ জানুয়ারি ওই প্রকল্পটির শিলান্যাস করার কথা রয়েছে। দীঘা, নিউটাউন এবং শিলিগুড়ি – তিনটি মন্দিরের ক্ষেত্রেই লাগোয়া সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হচ্ছে এবং পুরো পরিসর পরিচালনার জন্য ট্রাস্ট গড়া হচ্ছে।

কী যুক্তি দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস?

একের পর এক মন্দির গড়ার পিছনে কোনও রাজনীতি আছে, এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না তৃণমূল কংগ্রেস। তবে একান্ত আলোচনায় তারা বলে থাকেন যে বিজেপি যেভাবে হিন্দু ভোট একজোট করতে মেরূকরণের রাজনীতি করে থাকে, তারই পাল্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র এই মন্দির গড়ার পরিকল্পনা।

আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মন্ডল বলছিলেন, ‘কোনও মন্দিরই কিন্তু সরাসরি সরকার গড়ছে না। স্বশাসিত সংস্থাগুলি বানাচ্ছে এবং ট্রেজারি থেকেও কোনও অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না বলেই আমি জানি। এইসব মন্দিরগুলো তো বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট করছে। দীঘার মন্দিরটি উদ্বোধনের পরে কয় মাসের মধ্যেই এক কোটিরও বেশি মানুষ সেখানে গেছেন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন যদি হয়, সেটা কি খারাপ?’

তিনি আরও বলেন, অযোধ্যায় রামমন্দির যখন একটি অ-সরকারি ট্রাস্ট বানায় কিন্তু তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আকর্ষণ হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী – তখন তো কোনও প্রশ্ন ওঠে না!

তার কথায়, ‘অযোধ্যায় যখন প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় রামমন্দির গড়া হয়, তার উদ্বোধনের দিন হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীদের বদলে তিনিই হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় আকর্ষণ বিন্দু – তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলে না! তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কেন মন্দির আর তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন গড়া হলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে?’

‘বড় দেরি করে ফেলেছেন’

বছরের শেষে কলকাতায় তিন দিনের সফরে এসেছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি মূলত নির্বাচন নিয়েই বিজেপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা সারেন। তারই মধ্যে একটি সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র একের পর এক মন্দির গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে।

বিজেপি নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, ‘অমিত শাহ ওই সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছিলেন- আমিও সেই একই কথা বলব। একজন গর্বিত হিন্দু হিসাবে আমি মন্দির গড়াকে খারাপ কেন বলব? কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় দেরি করে ফেলেছেন।’

তার কথায়, ‘এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছেন। এখন তার মনে ভয় ঢুকেছে যে হিন্দুদের ভোট তিনি পাবেন না এবারের নির্বাচনে। তাই তাদের মন জিততে মন্দির বানাচ্ছেন। চেষ্টা করছেন যদি হিন্দুদের মন ঘোরানো যায়। কিন্তু অমিত শাহের মতোই আমিও বলব তিনি বড়ো দেরি করে ফেলেছেন।’

‘নরম হিন্দুত্ব’-র পথ কি আরও হিন্দু ভোট টানতে পারবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। তবে এলাকা বিশেষে ভোটের এই ব্যবধান যদিও কম বেশি আছে। বিজেপি এই ব্যবধান মেটাতে পারলেই তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে টপকিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের একটা ‘প্লাস পয়েন্ট’ হলো তাদের অতি শক্তপোক্ত সংগঠন এবং পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের গড়ে তোলা কর্মী-দলের কাঠামো। এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে বিজেপি কিন্তু প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটারদের সমর্থন কখনই পায় না। তাই আদতে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব কষতে হয় বাকি ৭০ শতাংশের মধ্যে থেকে।

আবার তৃণমূল কংগ্রেসেরও আশঙ্কা আছে যে তাদের দিকে যে হিন্দু ভোটাররা আছেন, সেখান থেকে কিছুটা বিজেপি টেনে নিতে যাতে না পারে।

সিনিয়র সাংবাদিক ও দ্য ওয়াল সংবাদ পোর্টালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকার বলছিলেন, ‘বিজেপি এখন তাই হিন্দু ভোটের আরও মেরূকরণ করতে চাইছে। তারা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার, নাগরিকত্ব এবং একেবারে সম্প্রতি মুস্তাফিজুর রহমানের মতো বিষয়গুলিকে তুলে আনছে নির্বাচনের আগে। এতে তারা মনে করছে যে হিন্দু ভোটারদের একটা অংশ তাদের দিকে ঘুরে যেতে পারে’।

তার কথায়, ‘ধর্মীয় মেরূকরণের হিসাব গত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটাই কেন্দ্রস্থলে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে। আবার আসাম আর কেরালাতেও মোটামুটি একই সময়ে নির্বাচন আছে। মুসলমান-বিরোধী হাওয়া তুলতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আসাম এবং কেরালাতেও তারা নিজেদের পালে হাওয়া লাগাতে পারবে বলে বিজেপি সম্ভবত হিসাব কষছে। এটারই পাল্টা চাল হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র এই একের পর এক মন্দির নির্মাণের ঘোষণাকে দেখতে হবে।’

যদিও বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং সরাসরি নগদ দেওয়া হয়, এরকম নানা প্রকল্প মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র সরকার অনেকদিন আগে থেকেই নিয়েছেন। কাকে তারা ভোট দেবেন, সেই ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কাছে এ ধরনের প্রকল্পগুলি চিরকালই একটা নির্ণায়ক হয়ে থেকেছে – সেই বামফ্রন্ট আমল থেকেই। আর নারীদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র জনপ্রিয়তা আছেই।

এসব সত্ত্বেও কেন আরও হিন্দু ভোট টানতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মন্দির গড়তে হচ্ছে – এই প্রশ্নের জবাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করেন বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়র বিরোধীরা যে অভিযোগ করেন, সেটা তো এই মন্দির গড়ার ঘোষণাগুলির মাধ্যমে ব্যালান্স করার একটা চেষ্টা তার আছেই। তবে সেই প্রচেষ্টা কিন্তু এখন নয়, ২০২১ এর ভোটের আগে থেকেই তিনি শুরু করেছিলেন। তবে যে ভোটাররা হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদে বিশ্বাস করেন, তাদের কিন্তু এইসব দেখিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দিকে টানতে পারবেন না।’ বিবিসি বাংলা


এমএইচআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর