সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

হামাস কেন ট্রাম্পের ওপর ভরসা করছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৫৯ এএম

শেয়ার করুন:

হামাস কেন ট্রাম্পের ওপর ভরসা করছে
হামাস কেন ট্রাম্পের ওপর ভরসা করছে

এক সময় যাকে ‘বর্ণবাদী’ এবং ‘অরাজকতার কারিগর’ বলে নিন্দা করেছিল হামাস, এখন তাকেই যুদ্ধ থামানোর সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক হিসেবে দেখছে ফিলিস্তিনের এই সংগঠন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি হামাসের এই মনোভাব পাল্টানোর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে চলমান গাজা যুদ্ধ ও শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর।

গত মাসে ট্রাম্প ও হামাসের শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে একটি ফোনালাপ হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ফোনালাপে আলোচনার পর হামাসের ভেতরে এই ধারণা গড়ে ওঠে যে, তারা যদি গাজায় আটক সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয়, তাহলে ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলকে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে বাধ্য করতে পারবেন। এই বিশ্বাস জন্মানোর পেছনে কাতারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রভাব ফেলেছে।


বিজ্ঞাপন


সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে এক বৈঠক শেষে ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোনে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন এবং কাতারে ইসরায়েলের এক বিমান হামলার জন্য ক্ষমা চাইতে বলেন। ওই হামলায় লক্ষ্য ছিল হামাসের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা, যারা তখন দোহায় অবস্থান করছিলেন। তবে ইসরায়েলের ওই হামলা ব্যর্থ হয়। কাতারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশের মাটিতে এমন হামলায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন বলে জানা গেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে চাপ দিতে দেখা যায় তাকে।

এই ঘটনার পর হামাস নেতাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় আগ্রহী এবং কাতারকে সামনে রেখে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার আছে। ফলে তারা মনে করতে শুরু করে, যুদ্ধ থামিয়ে জিম্মিদের মুক্তি দিলেও ট্রাম্পই সেই ব্যক্তি, যিনি ইসরায়েলকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে দেবেন না।

এই আস্থার প্রকাশ ঘটে সম্প্রতি। গত শুক্রবার গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় কোনো ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়াই হামাস সম্মত হয় ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দিতে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সোমবার মুক্তি দেওয়া হয়েছে ২০ জন জীবিত জিম্মিকে। ফিলিস্তিনি নেতাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল এর আগে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আগ্রাসন চালিয়েছে। তারপরও হামাস এই সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম্পের ওপর বিশ্বাস রেখে।

হামাসের পক্ষ থেকে একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানান, তারা জানেন এই বাজি উল্টেও যেতে পারে। কিন্তু তারা এটাও বিশ্বাস করেন, ট্রাম্প যেহেতু এই চুক্তির পেছনে এতটা শ্রম দিয়েছেন, তিনি তা ভেস্তে যেতে দেবেন না। তিনি আরও বলেন, জানুয়ারিতে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময়ও এমন কিছু ঘটেছিল, কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। তখনও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠরা আলোচনায় যুক্ত ছিল।


বিজ্ঞাপন


মিসরের শারম আল-শেখে গাজা শান্তি সম্মেলনে হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা অংশ নেন। সেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন। এই আলোচনা হামাসকে কিছুটা আশ্বস্ত করলেও, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনসহ তাদের প্রধান দাবি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

ট্রাম্প যে গাজা শান্তি পরিকল্পনা সামনে এনেছেন, তার প্রথম ধাপে যুদ্ধ বন্ধের পথ খোলা হলেও দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশেষ করে হামাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গাজার পুনর্গঠন ও সেনা প্রত্যাহার—এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর কোনো নিশ্চিত দিকনির্দেশনা এখনো আসেনি।

তবে হামাসের ধারণা, কাতার ইস্যু সামাল দেওয়া এবং এর আগের ইরান–ইসরায়েল সংঘাত থামানোর মতো বড় উদ্যোগে ট্রাম্প যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাতে তিনি ইসরায়েলকেও চাপে রাখতে পারবেন। এরই মধ্যে হোয়াইট হাউজের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাতারের আমিরকে ট্রাম্প ‘বন্ধু’ মনে করেন এবং দোহায় ইসরায়েলের হামলাকে তিনি পছন্দ করেননি। কাতারে হামলাকে ‘মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়েই ট্রাম্প আরব বিশ্বের কাছে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।

ইসরায়েলের বার–ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, কাতারে ইসরায়েল যেন আর কোনো হামলা না চালায়, ট্রাম্প এমন ঘোষণা দিয়েছেন। এতে হামাসের মনে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন বিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনের গাজার এক কর্মকর্তা জানান, ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ও ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সংঘাত বন্ধ করেন। সেটিও হামাস নেতাদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মাতে সাহায্য করেছে যে, এই মার্কিন রাজনীতিবিদ যুদ্ধ নয়, বরং সমঝোতার পক্ষেই কাজ করছেন। সূত্র: রয়টার্স

এইউ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর