ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখকে রাজ্য মর্যাদার দাবিতে বিক্ষোভে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক ও অধিকারকর্মী সোনাম ওয়াংচুককে গ্রেফতার করেছে দেশটির পুলিশ। তার বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (এনএসএ) মামলা দায়ের করেছে অঞ্চলটির স্থানীয় প্রশাসন। এই আইনে জামিনের কোনও সুযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে তিনি যোধপুর কারাগারে বন্দি রয়েছে। ওয়াংচুকের মুক্তি চেয়ে করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলী অ্যাংমো।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদনে গীতাঞ্জলি অভিযোগ করেছেন, সোনামের গ্রেফতারির এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তার স্বাস্থ্য ও সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য তাকে জানানো হচ্ছে না।
সর্বোচ্চ আদালতে আবেদনের পাশাপশি একই দাবিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জন রাম মেঘওয়াল এবং লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কবীন্দ্র গুপ্তকেও চিঠি দিয়েছেন গীতাঞ্জলি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে গীতাঞ্জলী লিখেছেন, ‘সোনাম ওয়াংচুকের মুক্তি চেয়ে আমি সুপ্রিম কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করেছি। আজ এক সপ্তাহ পেরিয়েছে; তবুও আমার কাছে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য, তার অবস্থা বা আটকের কারণ সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই।’
পোস্টে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘জনগণের স্বার্থকে সমর্থন করা কি পাপ?’
গীতাঞ্জলী এর আগেও তার স্বামীকে আটকে রাখা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন এবং অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক কারণেই তার স্বামীকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সিবিআই থেকে শুরু করে আয়কর দফতরের কর্মকর্তাদের সব অভিযোগোর পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত নথি দিয়েছি, তবুও সোনামকে বদনাম করার জন্য একটি ধোঁয়াশা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে ষষ্ঠ তফসিলের আন্দোলন দুর্বল করা যায়।’
এদিকে চলতি বছর সোনাম ওয়াংচুকের পাকিস্তান সফর নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে গীতাঞ্জলী বলেন, ‘ওয়াংচুক পাকিস্তানে একটি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এতে দোষের কিছু নেই। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ ও পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন মিডিয়া জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেই সম্মেলনের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘মিশন লাইফ’-এর প্রশংসা করেছিলেন ওয়াংচুক।’
প্রসঙ্গত, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা ও সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে কমপ্লিট শাটডাউনের কর্মসূচিতে লেহ শহরের রাস্তায় নামেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এসময় স্থানীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষে কমপক্ষে চারজন নিহত হয়েছেন আহত হন আরও প্রায় ৯০ জন। এছাড়াও সংঘর্ষের সময় একটি পুলিশের গাড়ি আগুন দেওয়া হয় এবং ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একটি অফিসেও হামলা চালায় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা।
তবে গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকেই চারদফা দাবিতে অনশন করছিলেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকসহ ১৫ জন। সেই দাবির মধ্যে ছিল, লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দিতে হবে, চাকরিতে সংরক্ষণ চালু করতে হবে, লেহ ও কার্গিলকে নিয়ে একটি লোকসভা আসন করতে হবে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে অনশনভঙ্গ করে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার গ্রামে চলে যান ওয়াংচুক।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বুধবার বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ ওয়াচুংক উসকানিমূলক বক্তৃতা দিলে জনতা অনশনস্থন থেকে বেরিয়ে বিজেপির অফিস আক্রমণ করে, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। ৩০ জনের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্মী আহত হয়েছে। পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলি চালায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে চারজনের মৃত্যু হয়।
এদিকে বিক্ষোভ সহিংসতার পর দিনই ওয়াংচুকের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান স্টুডেন্ট এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ (এসইসিএমওএল)-এর নিবন্ধন বাতিল করে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম না মেনে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছিল সংগঠনটি। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়াংচুক। সেই সঙ্গে দাবি করেছেন, আন্দোলন দমাতে তাকে ‘বলির পাঁঠা’ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ভারতের ব্যাপক জনপ্রিয় চলচিত্র ‘থ্রি ইডিয়টসে’ আমির খানের করা চরিত্রের বাস্তব ব্যক্তি সোনাম ওয়াংচুক। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজের জন্য ২০১৮ সালে রামোন মাগাসারে পুরস্কার জেতেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস
এমএইচআর




