হাতের মুঠোয় থাকা একটি স্মার্টফোন আর কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ—আজকের দিনে লাখো মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে রাজপথে নামাতে বা প্রতিবাদের ঝড় তুলতে যথেষ্ট। পুরোনো দিনের পোস্টার, লিফলেট কিংবা সভার যুগ পেরিয়ে আন্দোলনের খবর ছড়ানোর মূল মাধ্যম এখন ডিজিটাল পর্দা। বিশেষ করে জেন জি (Gen Z) বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আন্দোলনে প্রযুক্তি আর কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং হয়ে উঠেছে আন্দোলনের প্রধান সংগঠক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষে প্রযুক্তির এই নতুন ও শক্তিশালী রূপটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ: একটি ভিডিও বদলে দেয় পরিস্থিতি
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে দেশের তরুণেরা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরাখবর ও ভিডিও ছড়িয়ে মুহূর্তেই সাধারণ মানুষকে একতাবদ্ধ করেন। বিশেষ করে আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও ঘটনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিলেও থামানো যায়নি তথ্যের প্রবাহ। ভিপিএন (VPN), টেলিগ্রাম ও ভিওআইপি-র মতো প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তরুণেরা যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইন্টারনেট বা নেটওয়ার্ক বন্ধ করা গেলেও মানুষের প্রতিবাদের ইচ্ছাকে দাবিয়ে রাখা যায় না।
কেনিয়া: টিকটক হয়ে ওঠে ‘খবরের কাগজ’
২০২৪ সালে কেনিয়ায় ফাইন্যান্স বিলের বিরুদ্ধে তরুণদের বিক্ষোভে টিকটক ও এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্ম অনন্য ভূমিকা পালন করে। জটিল ও কঠিন সরকারি আইন বা বিলগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে তরুণেরা নানা ধরনের ছোট ভিডিও ও স্থানীয় ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করেন। এমনকি ‘ফাইন্যান্স বিল জিপিটি’ (Finance Bill GPT) তৈরি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জটিল আইনি ধারা সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলা হয়। আন্দোলনের প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ও গান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো একক নেতার ওপর নির্ভরতা কমে যায়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ (#RejectFinanceBill2024) হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মূল চালিকাশক্তি।
শ্রীলঙ্কা: সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ভিপিএন-এর ব্যবহার
২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কার ‘আরাগলায়াস’ (Aragalaya) আন্দোলনেও সোশ্যাল মিডিয়া ছিল প্রতিবাদের প্রধান অস্ত্র। #GoHomeGota ও #powercutlk-এর মতো হ্যাশট্যাগগুলো ঝড়ের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার যখন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, তখন তরুণেরা ভিপিএন ব্যবহার করে সেই সেন্সরশিপ বা বাধা অতিক্রম করেন। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তির দুনিয়ায় সেন্সরশিপ যেমন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার, ঠিক তেমনি তা এড়িয়ে যাওয়ার পথও উন্মুক্ত রাখে।
নেপাল: প্ল্যাটফর্মের নিষেধাজ্ঞা জন্ম দেয় নতুন প্রতিবাদের
২০২৫ সালে নেপালে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউব বন্ধ হয়ে গেলেও প্রতিবাদ থামেনি। বরং ডিসকর্ডের (Discord) মতো বিকল্প অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তরুণেরা আরও দ্রুত সংগঠিত হন এবং ভিপিএন ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখেন। সামাজিক মাধ্যম বন্ধের এই সরকারি সিদ্ধান্ত তরুণদের মনে নতুন প্রশ্ন তোলে—কেন সরকার সাধারণ মানুষের কথা বলার ও মত প্রকাশের স্বাধীন জায়গাগুলো কেড়ে নিতে চাইছে?
আন্দোলনের নেপথ্যের কারিগরি শক্তি
একুশ শতকের এসব আন্দোলনে ঐতিহ্যবাহী প্রচারের পাশাপাশি মূল ভূমিকা পালন করেছে বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি:
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন: প্রেরক ও প্রাপক ছাড়া অন্য কারো পক্ষে বার্তা বা গোপনীয় তথ্য দেখা অসম্ভব হওয়ায় আন্দোলনকারীরা নিরাপদে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
ভিপিএন (VPN): কোনো রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা ইন্টারনেট পরিষেবা ব্লক করা হলেও ভিপিএন-এর সাহায্যে ভিন্ন দেশের সার্ভারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার অব্যাহত রাখা যায়।
লাইভস্ট্রিমিং: ঘটনার একদম কেন্দ্রস্থল থেকে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের ফলে প্রথাগত গণমাধ্যম বা টেলিভিশনের ক্যামেরা পৌঁছানোর আগেই খবর পৌঁছে যায় লাখো মানুষের দোরগোড়ায়।
হ্যাশট্যাগ ও অ্যালগরিদম: নির্দিষ্ট কোনো স্লোগান বা হ্যাশট্যাগ মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমের কল্যাণে ট্রেন্ডিংয়ে চলে আসে এবং আন্দোলনকে বৈশ্বিক পরিচিতি দেয়।
জেনারেটিভ এআই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে খুব অল্প সময়ে পোস্টার, ইনফোগ্রাফিক, গান বা তথ্যমূলক সহজ কনটেন্ট তৈরি করে তা ব্যাপক প্রচার করা হয়।
ডিজিটাল ম্যাপিং ও ক্রাউডফান্ডিং: জমায়েতের সঠিক স্থান নির্ধারণ, রুট পরিকল্পনা এবং অনলাইনে তহবিল সংগ্রহ করে আন্দোলনকারীদের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া সহজ হয়।
প্রযুক্তি কেবল অনুঘটক, মূল কারণ মানুষের ক্ষোভ
প্রযুক্তি কখনোই কোনো আন্দোলনের মূল জন্মদাতা নয়। বেকারত্ব, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভই যেকোনো প্রতিবাদের আসল জ্বালানি। প্রযুক্তি কেবল সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে; একই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনেক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ডিপফেক ভিডিও বা ভুয়া খবর ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়।
স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বেড়ে ওঠা জেন জি প্রজন্ম রাজনীতির চিরাচরিত ভাষা ও প্রতিবাদের ধরনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। তাদের কাছে ভার্চুয়াল জগত আর রাজপথ আজ সমার্থক। একটি ভিডিও বা একটিমাত্র হ্যাশট্যাগ আজ স্বৈরাচারী মনোভাবের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে, আর একটি ভিপিএন হয়ে উঠতে পারে সেন্সরশিপের অন্ধকার দেয়াল ভাঙার চাবি। একুশ শতকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের নতুন মানচিত্র তাই এখন আর কেবল রাজপথে নয়, রচিত হচ্ছে স্মার্টফোনের আলোঝলমলে পর্দায়।
এজেড




