শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল: রাজনৈতিক কৌশল না বাস্তব পদক্ষেপ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল: রাজনৈতিক কৌশল না বাস্তব পদক্ষেপ?

সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা প্রকাশ করেছেন, যা একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত এবং এটি ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের উপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দীর্ঘদিনের, তবে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্পের এই আগ্রহ কি শুধু কূটনৈতিক কৌশল, নাকি এটি কোনো বাস্তব পদক্ষেপের দিকে এগোতে পারে? একইসঙ্গে, গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে ডেনমার্কের অবস্থান কী হবে? এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে চারটি সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


একটি সম্ভাবনা রয়েছে, ট্রাম্পের আগ্রহ কেবল একটি কূটনৈতিক তর্ক বা চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে—ট্রাম্প হয়তো গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টি শুধু রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলোর আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ঠেকাতে এবং ডেনমার্কের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সম্প্রতি, ডেনমার্ক আর্কটিক অঞ্চলের জন্য ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, যা ট্রাম্পের মন্তব্যের পরেই আসে। এতে ডেনমার্ক তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মূলত আমেরিকার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা যেতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্প সম্ভবত এই ধরনের মন্তব্য করছেন, যাতে ডেনমার্ক আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে সম্মত হয় এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশল উন্নত হয়।

এছাড়া, রয়েল ডেনিশ ডিফেন্স কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক জ্যাকোবসন মনে করেন, এটি ট্রাম্পের জন্য একটি কৌশল হতে পারে, যেখানে তিনি আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। অতএব, এই পদক্ষেপটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক চাপ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই হতে পারে, আর বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না আসতে পারে।


বিজ্ঞাপন


গ্রিনল্যান্ডের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যদিও এটি এখনও একটি আলোচনা পর্যায়ের বিষয়। অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী মনে করেন, একদিন তাদের স্বাধীনতা লাভ করা উচিত, তবে তারা জানে যে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। বর্তমানে, গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতি এবং কল্যাণ ব্যবস্থা অনেকটাই ডেনমার্কের সহায়তার উপর নির্ভরশীল, তাই স্বাধীনতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। তবে, যদি গ্রিনল্যান্ডের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়, তাহলে ডেনমার্কের সরকার তা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে, কারণ সেখানে বর্তমানে একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাটে ফ্রেডেরিকসেন সম্প্রতি বলেছেন, তারা স্বাধীনতা চায়, তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হতে পারে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি মুক্ত সম্পর্কের মাধ্যমে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যা অনেকটা মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, মাইক্রোনেশিয়া এবং পালাউয়ের মতো হতে পারে।

তবে ডেনমার্কের ইতিহাসগত দায়িত্বের প্রতি তাদের মনোভাব এখন অনেক বদলেছে। ডেনমার্কের সরকার আগে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার বিষয়টি সরাসরি বিরোধী ছিল, তবে বর্তমানে বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন অবস্থানে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি সম্পর্ক রেখে স্বাধীনতার পক্ষে যাবে, তবে সেটি সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নাও হতে পারে, বরং কিছুটা স্বায়ত্তশাসন থাকতে পারে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কৌশলও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে, ট্রাম্প ডেনমার্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করার হুমকি দিয়েছেন, যা ডেনমার্কের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি এই শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়, তবে ডেনমার্ককে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু ছাড় দিতে হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প এই কৌশলটি ব্যবহার করতে পারেন, যাতে ডেনমার্ক অর্থনৈতিকভাবে বিপদে পড়ে এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির প্রতি নমনীয় হতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা বিষয়ক সিদ্ধান্তও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অনেক পণ্যের প্রধান বাজার, যেমন ইনসুলিন ও শ্রবণযন্ত্র, এবং এই ধরনের পণ্যের উপর শুল্ক বৃদ্ধি করার ফলে ডেনমার্ক তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমেরিকার দাবির দিকে নজর দিতে বাধ্য হতে পারে।

যদিও অনেকেই মনে করছেন ট্রাম্পের পারমাণবিক বা সামরিক পদক্ষেপ অবাস্তব, তবে একে পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে না। ১৯৫১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং সেখানে তাদের সৈন্য অবস্থান করছে। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক পদক্ষেপ খুব কঠিন হবে না, তবে এটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার জন্ম দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প যদি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তবে তা ন্যাটো জোটের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর অংশ এবং সেখানে কোনো আক্রমণ ন্যাটোকে সরাসরি আক্রমণ হিসাবে গণ্য হবে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করবে। যদি ট্রাম্প এটি বাস্তবায়ন করতে যান, তবে এটি পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে গুরুতর রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে, যা ন্যাটো জোটকে বিপর্যস্ত করতে পারে।

এখন পর্যন্ত, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ কতটা বাস্তব এবং কার্যকরী হতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। তবে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বৈশ্বিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। যে কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। তাই গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যত শুধুমাত্র ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র বা গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকটেও পরিণত হতে পারে। সূত্র: বিবিসি

এইউ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর