কে এই শিরিন আকলেহ, ফিলিস্তিনে তার অবদান কী?

প্রকাশিত: ২২ মে ২০২২, ০৩:০০ পিএম
কে এই শিরিন আকলেহ, ফিলিস্তিনে তার অবদান কী?
ফিলিস্তিনের দেয়ালে শিরিন আকলেহর গ্রাফিতি

ইসরায়েলি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল পশ্চিম তীরের জেনিনে ১১ মে বুধবার সকালে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ। যুদ্ধ কিংবা শান্তি, যেকোনো সময়ই এই অঞ্চলের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন। ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে কথা বলাই তার কাল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কে এই আবু আকলেহ?
আবু আকলেহ ১৯৭১ সালে জেরুসালেমে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের সদস্যরা ছিলেন বেথলেহেমের আরব ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সময় কাটিয়েছেন, নিউজার্সিতে বসবাসকারী তার মায়ের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন।

আবু আকলেহ বেইথ হানিনার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, তারপর স্থাপত্যবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য জর্ডান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাট্রিকুলেশন করেন, কিন্তু বাণিজ্য না করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবর্তে তিনি জর্ডানের ইয়ারমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন যেখান থেকে তিনি মুদ্রণ সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক শেষ করে আবু আকলেহ ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন।

shirin akleh
শিরিন আকলেহ

কর্মজীবন
আবু আকলেহ রেডিও মন্টে কার্লো এবং ভয়েস অফ প্যালেস্টাইনের সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ইউএনআরডব্লিউএ, আম্মান স্যাটেলাইট চ্যানেল ও মিফতাহের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি আল জাজিরার সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করেন এবং এর আরবি ভাষার চ্যানেলে রিপোর্টার হিসেবে সুপরিচিত হন। তিনি পূর্ব জেরুসালেমে থাকতেন ও কাজ করতেন। দ্বিতীয় ইন্তিফাদাসহ ফিলিস্তিনের সাথে সম্পর্কিত প্রধান ঘটনাগুলির প্রতিবেদনের পাশাপাশি সাথে ইসরায়েলি রাজনীতি তুলে ধরতেন। তিনি প্রায়ই ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত ফিলিস্তিনিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিষয়ে রিপোর্ট করতেন। অন্যান্য অনেক ফিলিস্তিনি এবং আরবদের সাংবাদিকতায় পেশাজীবন গড়তে অনুপ্রাণিত করেছিলেন শিরিন।

যেভাবে মৃত্যু
১১ মে, ২০২২ এ আবু আকলেহ পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিযানের প্রতিবেদন করার সময় গুলিবিদ্ধ ও নিহত হন। আল জাজিরা ও ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তাকে আইডিএফ দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। একজন এজেন্স ফ্রান্স-প্রেসের ফটোসাংবাদিকও রিপোর্ট করেছেন যে, ইসরায়েলি বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রতিবেদনের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ এবং বেসরকারি সংস্থার বিবৃতিতেও ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা তার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ইসরায়েল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তিনি ফিলিস্তিনিদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনিদের জন্যই জীবন উৎসর্গ
ফিলিস্তিনিদের কাছে শিরিন ছিলেন এক নির্ভরতার প্রতীক। যখনই ইহুদিবাদীরা অভিযানের নামে বর্বরতা চালাত অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনে, তখনই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন শিরিন।মার্কিন নাগরিকত্ব পেলেও শিরিনের মন পড়ে থাকত জন্মভূমি জেরুজালেমে। এখানকার নির্যাতিত মানুষগুলোর মুক্তি-সংগ্রামে তিনি ছিলেন তাদের নীরব সঙ্গী। দিন কিংবা রাত, যখনই ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের খবর পেতেন, তখনই ক্যামেরা কাঁধে ছুটে যেতেন শিরিন।

তার সহকর্মী লিন্ডা বলেন, ফিলিস্তিনে সাংবাদিকতা মানেই মৃত্যুকে সঙ্গী করে দায়িত্ব পালন করা। আমি গত ৯ বছর ধরে ফিলিস্তিনে অত্যন্ত ভয়ে সাংবাদিকতা করে আসছি। শিরিন গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অসীম সাহসিকতা নিয়ে আল জাজিরার হয়ে ফিলিস্তিনে সাংবাদিকতা করে আসছিলেন।

shirirn
শিরিন হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ

ফিলিস্তিনের রাস্তায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কিংবা সংবাদ সংগ্রহ করতে শরণার্থী শিবিরের সরু গলিতে গিয়েছেন। বিশ্বের কাছে তিনি নানা ঘটনা এত বাগ্মিতার সঙ্গে এবং এত স্বচ্ছতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতেন যে সেটাতে জাদুকরী একটা বিষয় থাকত। শিরিন একজন যুদ্ধ সাংবাদিক ছিলেন। অথচ তার হৃদয় ছিল দয়ায় পূর্ণ। চরম অমানবিক পরিবেশের মধ্যে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্যরকম মানবিক। শিরিন ছিলেন একজন দরদি সাংবাদিক। জন্মভূমি ফিলিস্তিনের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রেম ও যন্ত্রণার মিশেলে সেই দরদের প্রকাশ ঘটত।

ফিলিস্তিনের সংবাদ পরিবেশনে শিরিনের আন্তরিকতা দেখে আরব বিশ্বেও তার জনপ্রিয়তা যথেষ্ট বেড়ে গিয়েছিল। তাকে 'ফিলিস্তিনের কন্যা' বলেও ডাকা হতো।

বিশ্বজুড়ে নিন্দা
শিরিন আবু আকলেহ খুনের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা প্রকাশ করা হয়। যথাযথ ও অনুপুঙ্খ তদন্তও দাবি করেন ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম নিডস। সে সময় তিনি এক টুইটবার্তায় বলেন, 'মার্কিন-ফিলিস্তিনি সংবাদিক শিরিন আবু আকলেহের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। আমি আশা করছি, ইসরায়েলের সরকার শিরিনের নিহত হওয়া ও অপর এক সাংবাদিক আহত হওয়র বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে এবং অনুপুঙ্খ তদন্ত করবে।'

ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)। এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের ইইউ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, 'আমরা মূল অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।'

এছাড়া বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো শিরিন হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।

শিরিন হত্যার তদন্ত করবে না ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক দাবি থাকলেও এই ঘটনার তদন্ত করবে না বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ জানিয়েছে, শিরিন হত্যার তদন্ত ইসরায়েলি সৈন্যদের সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করবে এবং তা ইসরায়েলিদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে। যদিও ইসরায়েলি সৈন্যদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানায়, তারা ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিল। তারা কোনো সাংবাদিককে গুলি করেনি।

shirin akleh
শিরিন আকলেহ

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বীকৃতি
আবু আকলেহের কর্মজীবন অন্যান্য অনেক ফিলিস্তিনি ও আরবদের সাংবাদিক হতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার সরাসরি টেলিভিশন প্রতিবেদন ও স্বতন্ত্র সাইনঅফ বিশেষভাবে সুপরিচিত ছিল। তার মৃত্যুর পর, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং এনপিআর উভয়ই তাকে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে "একটি পারিবারিক গর্ব" হিসাবে বর্ণনা করেছে। টাইমস অফ ইসরায়েল তাকে 'আরব গণমাধ্যমের সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে একজন প্রবীণ সাংবাদিক হিসাবে চিহ্নিত করেছে। বিবিসি তাকে ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং দর্শক এবং সহকর্মীদের দ্বারা প্রশংসিত বলে বর্ণনা করেছে।

ইসরায়েলি দখলদারত্বের নির্মম শিকার শিরিন। আরবিতে শিরিনের অর্থ হচ্ছে, নিষ্কলুষ সুন্দর। শিরিন আবু আকলেহ ওপারে শান্তিতে থাকুন। তার হত্যাকারী ও দখলদার ইসরায়েলের জন্য ঘৃণা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, উইকিপিডিয়া

একে