শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

সুইডেনে কেন বারবার কোরআন পোড়ানোর ঘটনা ঘটে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৩, ০২:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

সুইডেনে কেন বারবার কোরআন পোড়ানোর ঘটনা ঘটে?
পবিত্র কোরআন পোড়ানোর পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে হেফাজতে নেয় সুইডিশ পুলিশ। ছবি: আল জাজিরা

সুইডেন ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ। এর রাজধানী স্টকহোম। শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে খ্যাতি আছে সুইডেনের। তবে দেশটি বিশ্বজুড়ে বারবার খবরের শিরোনামে এসেছে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন অবমাননার জন্য। ঈদুল আজহার দিনে দেশটির রাজধানী স্টকহোমের একটি মসজিদের বাইরে এমন ঘটনা ঘটান দুই ব্যক্তি। এরপর আবারও বিশ্বের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে সুইডেন।

স্টকহোমের সেন্ট্রাল মসজিদের সামনে ঈদুল আজহার দিনে ইরাক থেকে আসা অভিবাসী সালমান মোমিকা ও এক ব্যক্তি পবিত্র কোরআনে আগুন দেয়। সুইডেনের সরকারি ব্রডকাস্টার এসটিভি জানায়, এই ব্যক্তি কোরআন নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। কোরআন পোড়ানোর অনুমতি নিতে আদালতে গিয়েছিল সে। পরে আদালত তাকে অনুমতি দেয়।


বিজ্ঞাপন


কোরআন পোড়ানোর ঘটনার পর সুইডেন জানায় যে, এমন ঘটনা অনভিপ্রেত হলেও নিষিদ্ধ নয়।

এর আগেও দেশটিতে বেশ কয়েকবার পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদ রাসমুস পালুদান। শুধু সুইডেন নয় ডেনমার্কে গিয়েও একই ঘৃণিত কাজ করেন তিনি। পালুদান সুইডেন ও ডেনমার্কের দ্বৈত নাগরিক।

এসব ঘটনা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলে দাবি করে সুইডেন। তবে কারও অনুভূতিতে আঘাত বা কাউকে আক্রমণাত্মক বা উসকানি দেওয়ার জন্য ঘটানো কোনো ঘটনা মত প্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

যদিও পশ্চিমা বেশিরভাগ দেশ মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও কোরআন পোড়ানোর বিষয়ে অনুমতি দেয় না। কিন্তু সুইডেন এটিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পশ্চিমা বেশিরভাগ দেশে এই জাতীয় কাজ অপরাধের পর্যায়ে পড়লেও সুইডেনর এটি অপরাধ নয়।


বিজ্ঞাপন


পূর্বের ঘটনা
এর আগে সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের বিরোধিতা করায় তুরস্কের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয় সুইডেন ও ডেনমার্কে। সেই বিক্ষোভে পবিত্র কোরআন পোড়ান বিতর্কিত ও উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদ পালুদান। বারবার এই ঘটনা ঘটালেও তার বিরুদ্ধে কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

rasmus paludan
 উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদ পালুদান

বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
ঈদুল আজহার দিনে স্টকহোমে পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্ব। আরব ও মুসলিম দেশগুলোই শুধু নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, পোপ ফ্রান্সিসসহ পশ্চিমারাও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।

এই ঘটনায় নিন্দা জানালেও ন্যাটোতে যোগ দিতে সুইডেনের পক্ষে কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্ককে এই বিষয়ে অনুমতি দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল বলেছেন, ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানো ঘৃণ্য ও কষ্টদায়ক কাজ। সব আইনগত বৈধ কাজই প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত নয়। আমরা সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানে তুরস্ক ও হাঙ্গেরির দ্রুত ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রত্যাশা করছি।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কড়াভাবে বলেছেন, ‘আমরা এই পশ্চিমাদের উচিত শিক্ষা দিয়ে বোঝাব, মুসলিমদের অপমান করাটা চিন্তার স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না।’

টেলিভিশন ভাষণে এরদোয়ান বলেছেন, ‘যতক্ষণ ইসলামোফোবিয়া ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের জয় না হচ্ছে, তত দিন আমরা যতটা সম্ভব কড়া প্রতিক্রিয়া জানাব।’ 

তুরস্কের প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, ‘সুইডেন সন্ত্রাসবাদীদের হাত ধরে চলছে। তারা কখনো তুরস্কবিরোধী, কখনো ইসলামবিরোধী, কখনো একসঙ্গে ইসলাম ও তুরস্কবিরোধী কাজ করে চলেছে।’

সুইডেনে কোরআন পোড়ানোর ঘটনায় ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)’ জরুরি বৈঠক করে। ওআইসি সেক্রেটারি জেনারেল হিসেন ব্রাহিম ত্বহা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের জরুরি প্রয়োগের বিষয়ে আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিরাম অনুস্মারক পাঠাতে হবে, যা স্পষ্টভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষের কোনো সমর্থনকে নিষিদ্ধ করে।’

OIC
পবিত্র কোরআন পোড়ানোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ওআইসি

কোরআন পোড়ানোর ঘটনাকে উসকানিমূলক, অসুস্থ বিবেচনাপ্রসূত ও অগ্রহণযোগ্য বলেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেন, ‘ইরানের সরকার ও জনগণ এ ধরনের অপমান সহ্য করে না। এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে জন্য সুইডেনের প্রতি আহ্বান জানাই।’

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরব বলেছে, ‘বারবার এমন ঘৃণ্য কাজ করা হচ্ছে, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

সুইডেনে পবিত্র কোরআন অবমাননার সর্বশেষ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এটি এক বিবৃতিতে কোরআন অবমাননাকে ‘একটি প্রকাশ্য উস্কানি’ বলে মন্তব্য করেছে জোটটি।

এক বিবৃতিতে ইইউ জানিয়েছে, সুইডেনে যেসব ‘আক্রমণাত্মক ও অবমাননাকর’ কাজ করা হয়েছে তাতে এই জোটের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়নি। এ ইউরোপীয় জোটটি দাবি করেছে, ‘বর্ণবাদ, বিদেশিদের-বিরোধিতা এবং এ সংক্রান্ত অসহিষ্ণুতার’ কোনো স্থান ইউরোপে নেই।

পোপ ফ্রান্সিস সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদপত্র আল-ইত্তিহাদকে বলেছেন যে, কোরআন পোড়ানোর অনুমতি দেওয়া মোটেও কাম্য নয় এবং এটি নিন্দনীয়। পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

এছাড়াও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেছে। মুসলিম দেশগুলো কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে এর বিচার দাবি করেছে।

পরিণতি
পবিত্র কোরআন এবং মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর অবমাননা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে সবচেয়ে বড় আঘাত। এর আগে ফ্রান্সের একটি ম্যাগাজিনও বেশ কয়েকবার মহানবীকে নিয়ে অবমাননাকর চিত্র প্রকাশ করেছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম দেশগুলো এসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

সুইডেন শুরুতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বললেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবশেষে নিন্দা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া ওই ব্যক্তিকে অন্যের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপরাধে গ্রেফতার করে।

এর আগে ফ্রান্স শুরুতে একই রকম সুর তুললেও আন্তর্জাতিক ব্যাপক চাপের মুখে সুর নরম করে। মহানবীর অবমাননার পর ফ্রান্সকে বয়কটের ডাক ওঠে। এর প্রভাব পড়ে ফ্রান্সের অর্থনীতিতেও। শেষ পর্যন্ত দেশটি এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বয়কটের আহ্বান প্রত্যাখ্যানের দাবি জানায়।

একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর