শনিবার, ২৫ মে, ২০২৪, ঢাকা

যুক্তরাজ্যের নতুন আইনে অভিবাসন প্রত্যাশীরা ‘অপরাধী’

অভিবাসন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ মার্চ ২০২৩, ০২:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

যুক্তরাজ্যের নতুন আইনে অভিবাসন প্রত্যাশীরা ‘অপরাধী’

অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ন্ত্রণে একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। অভিবাসী নৌকা ঠেকাতে ‘স্মল বোটস বিল’ বা ‘ছোট নৌকা আইন’ নামে একটি নতুন আইন প্রস্তাব করেছে দেশটির সরকার। এই আইনের ফলে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে আসা অভিবাসন প্রত্যাশীরা ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে এমন আইনে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসী নৌকা যুক্তরাজ্যে প্রবেশ বন্ধ করা যাবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার (৭ মার্চ) দেশটির সংসদে একটি নতুন ‘অবৈধ অভিবাসন বিল’ পেশ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, ইংলিশ চ্যানেল জুড়ে আসা ছোট নৌকায় এবং অন্যান্য সম্ভাব্য অভিবাসন রুট দিয়ে আসা সব অনিয়মিত অভিবাসীকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা হবে।

অভিবাসীদের ফৌজদারি আইনের আটক রাখা হবে। এরপর তাদেরকে নিজ দেশে বা নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠানো হবে। সেইসাথে যুক্তরাজ্যে তাদের পুনরায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।

সরকার বলছে, নতুন বিলটি ২০২১ সালে পাস হওয়া জাতীয়তা এবং সীমানা আইনের আওতার বাইরে থাকা অভিবাসীদের বাধা দেবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং রুট জুড়ে ছোট নৌকায় ভ্রমণ করা পাচারকারীদের বাধা দেয়া হবে।

প্রস্তাবিত আইন উপস্থাপনের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান এক টুইটে বলেন, ‘যদি আপনি এখানে (যুক্তরাজ্য) অবৈধভাবে আসেন তাহলে আর থাকতে পারবেন না। এই আইন নিয়ে যেকোনো চ্যালেঞ্জের জন্য আমরা প্রস্তুত।’


বিজ্ঞাপন


ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়া ব্রেক্সিট চুক্তির মূল অঙ্গীকার ছিল সীমানা নিয়ন্ত্রণ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে একটি ছিল অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলা।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছেন, ‘নতুন আইনটি যুক্তরাজ্যের সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবে।’

তবে বিলটি উত্থাপনের আগে সমালোচকরা বলছেন, আগের পরিকল্পনাটিও অকার্যকর ছিল। এটি সম্ভবত যুক্তরাজ্যের সরকারগুলোর ধারাবাহিক অসম্পূর্ণ অভিবাসন অঙ্গীকারগুলোর সর্বশেষ উদ্যোগ হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে আন্তজার্তিক এনজিও ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির নির্বাহী পরিচালক লরা কির্ক-স্মিথ বলেছেন, এটি ছোট নৌকাগুলোর চ্যানেল পাড়ি দেওয়া বন্ধ করবে না। বরং নৌকায় থাকা লোকদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করবে। ফলে ন্যায্যতা এবং সহানুভূতির জন্য ব্রিটেনের বৈশ্বিক খ্যাতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Rishi Sunak
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক

আইন প্রসঙ্গে সরকারের ‘যুক্তি’

ব্রিটিশ সরকার বলছে, অভিবাসীদের অনেকেই ‘প্রকৃত উদ্বাস্তু’ নয়। বরং তারা ‘অর্থনৈতিক অভিবাসী’। এর উদাহরণ হিসেবে গত বছর আলবেনিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের দিকে ইঙ্গিত করেছে ব্রিটিশ সরকার। তাদের মতে আলবেনিয়া নিরাপদ দেশ।

মঙ্গলবার দ্যা সান পত্রিকায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেন, “যারা ছোট নৌকায় করে আসছেন তারা সরাসরি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে আসছেন না অথবা জীবনে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন না। তার পরিবর্তে তারা চ্যানেল অতিক্রম করার আগে নিরাপদ ইইউ দেশগুলোর মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেছেন।”

যুক্তরাজ্যে বেড়েছে অভিবাসী প্রত্যাশীদের আগমন

যুক্তরাজ্যে যেতে প্রতি বছর হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী উত্তর ফ্রান্স উপকূলে ভিড় করেন। তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাজ্যে বাস করায় তারা সেখানে যেতে চান। ফলে ফ্রান্সে আশ্রয় আবেদন করে সেই দেশের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে আগ্রহী নয় তারা।

২০২২ সালে নৌকায় চড়ে ব্রিটেনে এসেছিলেন ৪৫ হাজারেরও বেশি লোক। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার এবং ২০২০ সালে ছিল ৮ হাজার ৬০০ জন। যদিও এই সংখ্যা ইইউ এর তুলনায় কম।

ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টের মতে, হোম অফিসের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুমান করছে, ২০২৩ সালেও ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপার আরও বেড়েছে৷ ইতিমধ্যেই জানুয়ারির শুরু থেকে চ্যানেল জুড়ে প্রায় তিন হাজার লোক এসেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

uk-migrantsদেশটিতে এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফলে অভিবাসন প্রত্যাশীদের দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ও হোটেলে অবস্থান করতে হচ্ছে। মিলছে না বৈধভাবে কাজ করার অনুমতিও।

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ২০২২ সালে প্রায় ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এই সংখ্যা ফ্রান্স বা জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এই দুটি দেশ গত বছর দুই লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আশ্রয় আবেদন নথিভুক্ত করেছে। 

নতুন বিল কার্যকর হলে কি হবে?

যুক্তরাজ্য সরকার বলছে নতুন আইন কার্যকর হলে আফগানিস্তান, হংকং এবং ইউক্রেন থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আশ্রয়ের আরও আইনি পথ তৈরি করবে। তবে কতজন আশ্রয়প্রার্থীকে নেওয়া হবে বা কখন এই প্রক্রিয়া শুরু হবে সেই সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।

এদিকে মোসেলিসহ অ্যাক্টিভিস্টরা সতর্ক করেছেন যে, আইনটি আরও দীর্ঘ বিলম্ব এবং আশ্রয় আবেদনের দীর্ঘ জটিলতার দিকে পরিচালিত করবে। অনেক আশ্রয়প্রার্থী ইতিমধ্যেই তাদের আবেদনগুলো প্রক্রিয়া করার আগে ১৮ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

lucy-mayblin
সমাজবিজ্ঞানী লুসি মেবলিন

নতুন আইনের সমালোচনা

চ্যানেল পারাপার নিয়ে গবেষণা করছে একটি গবেষক দল। সেই দলের সদস্য শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী লুসি মেবলিন বলেন, ‘আগের পরিকল্পনায় নৌকাগুলো বন্ধ করার সম্ভাবনা কম ছিল। কারণ সারা বিশ্ব থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আশ্রয়ের আবেদনের সংখ্যাকে প্রভাবিত করে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘লোকেরা কেন ফরাসি উপকূল ত্যাগ করে সে সম্পর্কে আমরা জানি। গত ৩০ বছরে ফ্রান্সের ব্রিটিশ সীমান্তে বিনিয়োগে এবং গত বছরে পাস হওয়া জাতীয়তা ও সীমান্ত আইনের তেমন কোন প্রভাব কাজ করেনি। তা থেকে বোঝা যায় যে প্রতিবন্ধকতার প্রভাব আসলে এখানে কাজ করবে না।’

সমালোচকরা আরও উল্লেখ করেছেন, এই বিলটি অবৈধভাবে আগতদের ফেরত পাঠাতে ব্রিটিশ হোম অফিসের ওপর একটি আইনি দায়িত্ব আরোপ করবে। তবে তৃতীয় কোন নিরাপদ দেশ তাদের নিতে ইচ্ছুক হবে কী না সেটিও স্পষ্ট নয়।

colin-yeo
অভিবাসন এবং শরণার্থী আইন বিশেষজ্ঞ কলিন ইয়ো

আইনটি ‘ব্যয়বহুল এবং মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত

এই আইনের সমালোচকদের মতে, চ্যানেলে আসা ব্যক্তিদের আটকে রাখার জন্য পর্যাপ্ত স্থান খুঁজে পাওয়াও একটি বড় বাধা হবে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরি বলছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫১৩ জনকে আটক রাখার সক্ষমতা রয়েছে। 

মেবলিন বলেন, একজন ব্যক্তিকে আটক রাখতে প্রতিদিন ১০৭ পাউন্ড খরচ হয়। গত বছর যারা চ্যানেল হয়ে এসেছিল তাদের আটক রাখতে ১৭৫ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি খরচ হয়েছে। আটক রাখার পরিকল্পনাগুলো দুর্বল অভিবাসীদের জন্য আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত পরিকল্পনা হলো একজন ব্যক্তিকে ২৮ দিনের জন্য আটকে রাখা এবং পরবর্তীতে তাদেরকে সরকারি আশ্রয় সুবিধা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া। এর অর্থ হল একটি বড় এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে ন্যূনতম অধিকারের বাইরে রাখা। মনে হচ্ছে, এই মানুষগুলো শোষণের ঝুঁকিতে থাকবে।’

অভিবাসন এবং শরণার্থী আইন বিশেষজ্ঞ কলিন ইয়ো টুইটারে বলেন, অভিবাসীদের আটক রাখার বিষয়টি একটি বড় সমস্যা হবে। কারণ, সত্যিই যদি সবাইকে ২৮ দিন আটকে রেখে পরে কোনো ব্যবস্থা ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে এটি অদ্ভুত হবে। এটি সত্যিই অত্যন্ত ব্যয়বহুল, অর্থহীন এবং সম্ভবত ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস (ইসিএইচআর) এর লংঘন হবে।

রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী এনভার সলোমন মনে করেন, এই আইনটি ‘ব্যয় বাড়াবে ও বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি করবে।

এমএইচটি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর